ঢাকা, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষ:

অনেকে ‍৪ ঘণ্টা ঘুমিয়েও স্বাভাবিক থাকেন যেভাবে

লাইফস্টাইল ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২:৪৫, ৬ নভেম্বর ২০২৬  

ছবি: অন্তর্জাল

ছবি: অন্তর্জাল


একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। এ কথা সবার জানা। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে ঘুমের চাহিদা এক নয়। কিছু মানুষ মাত্র ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা ঘুমিয়েও সতেজ থাকেন। দিনের কাজেও তাদের ক্লান্তি বা মনোযোগের ঘাটতি দেখা যায় না।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে বিশেষ কিছু জিনগত বৈশিষ্ট্য। তবে কম ঘুমিয়েও সুস্থ থাকার রহস্য এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।

কম ঘুমের পেছনে জিনের ভূমিকা
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষকরা ঘুমের সময় নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করেন। যাদের শরীরে এই পরিবর্তন আছে তারা সাধারণ সময়েই ঘুমাতে যান। কিন্তু খুব ভোরে তাদের ঘুম ভেঙে যায়। ফলে রাতে ৪ থেকে সাড়ে ৬ ঘণ্টা ঘুমিয়েই দিন শুরু করেন।

এই বংশগত বৈশিষ্ট্যের নাম ফ্যামিলিয়াল ন্যাচারাল শর্ট স্লিপ (এফএনএসএস)। পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞানীরা এর সঙ্গে সম্পর্কিত আরও কয়েকটি জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করেছেন।

গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া আণবিক জীববিজ্ঞানী ইং-হুই ফুর মতে, এই বৈশিষ্ট্য থাকা মানুষদের কম ঘুমিয়েও স্বাভাবিক থাকার বিষয়টি বেশ রহস্যময়। প্রাথমিক গবেষণায় অবশ্য ইঙ্গিত মিলেছে, এসব জিনগত পরিবর্তন কেবল ঘুমের সময় কমায় না, বরং ঘুমের অভাবজনিত কিছু সমস্যা থেকেও শরীরকে রক্ষা করতে পারে।

২০১৯ সালে ইঁদুরের ওপর করা এক পরীক্ষায় দেখা যায়, এফএনএসএসের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত পরিবর্তন থাকা ইঁদুর কম ঘুমালেও স্মৃতিশক্তিতে তেমন পরিবর্তন হয়নি। আরেকটি পরীক্ষায় দেখা যায়, এ ধরনের কিছু বৈশিষ্ট্য আলঝেইমার রোগের মতো সমস্যা থেকেও সুরক্ষা দিতে পারে।

মানুষের ওপর করা গবেষণাতেও পাওয়া গেছে একই ধরনের ইঙ্গিত। ২০১৪ সালে রেনাটা পেলেগ্রিনো ও তার সহ-গবেষকরা স্লিপ সাময়িকীতে একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। গবেষণায় ১০০ জোড়া যমজ মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। তাদের মধ্যে এক জোড়া যমজ ভাইয়ের একজনের শরীরে বিএইচএলএইচই৪১ (ডিইসি২) জিনের বিশেষ পরিবর্তন পাওয়া যায়। তিনি গড়ে ৫ ঘণ্টা ঘুমাতেন, আর তার ভাই ঘুমাতেন প্রায় ৬ ঘণ্টা ৫ মিনিট। দুজনকে টানা ৩৮ ঘণ্টা জাগিয়ে রাখার পর দেখা যায়, জিনগত পরিবর্তন থাকা ভাইটির কাজে মনোযোগ হারানোর ঘটনা অন্যজনের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম ছিল।

গবেষকরা আরও দেখেন, কম ঘুমানো ভাইটির গভীর ঘুমের পরিমাণ প্রায় একই ছিল। ঘুমের এই পর্যায়ে শরীর ও মস্তিষ্ক বিশ্রাম পায় এবং স্মৃতি সংরক্ষণসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন হয়। অর্থাৎ, তার ঘুমের সময় কম হলেও গভীর ঘুমের পরিমাণ কমেনি।

কম ঘুমের ওষুধ তৈরির সম্ভাবনা
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, কম ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত জিন নিয়ে ওষুধশিল্পেও আগ্রহ বাড়ছে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এসব জিনের কার্যপদ্ধতি বুঝতে পারলে ভবিষ্যতে ঘুমের সমস্যার চিকিৎসায় নতুন ওষুধ তৈরি করা সম্ভব হবে। এমনকি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জরুরি সময়ে কম ঘুমিয়েও কর্মক্ষম রাখার উপায় বের করতেও এই গবেষণা কাজে লাগতে পারে।

তবে ওষুধ তৈরির আগে জানতে হবে, এসব জিন কীভাবে শরীরকে ঘুমের অভাবজনিত ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। গবেষক ফু সতর্ক করে বলেছেন, বিষয়টি না বুঝে ওষুধ তৈরি করলে দীর্ঘ মেয়াদে আলঝেইমার, পারকিনসন বা ক্যানসারের মতো রোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ঘুমের সময় নির্ধারণে কেবল বিরল জিনগত পরিবর্তন নয়, আরও অনেক জিনের ভূমিকা আছে। গবেষকদের ধারণা, মানুষের ঘুমের সময়ের পার্থক্যের ৩০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত জিনগত কারণে হতে পারে।

সম্প্রতি কিংস কলেজ লন্ডনের জিনবিজ্ঞানী ইসাবেল অস্টিন-জিমারম্যান ও তার সহ-গবেষকদের একটি গবেষণায় প্রায় ৬ লাখ ৪৮ হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। ওই গবেষণায় ঘুমের সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত ২৩৪টি স্বতন্ত্র জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করা হয়। গবেষকদের মতে, প্রতিটি জিনগত বৈশিষ্ট্যের প্রভাব সামান্য। একেকটির কারণে ঘুমের সময় গড়ে প্রায় এক মিনিট কমবেশি হতে পারে। তবে অনেকগুলো জিনগত বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে কাজ করলে ঘুমের সময়ের ওপর এর সম্মিলিত প্রভাব বাড়ে।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কম ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত বৈশিষ্ট্য অনিদ্রা ও ক্লান্তির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ ছাড়া, এডিএইচডি, বিষণ্নতার লক্ষণ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সঙ্গেও এসব বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

কম ঘুমিয়েও ভালো থাকার ভুল ধারণা
কম ঘুমের আরেকটি সমস্যা হলো, মানুষ নিজের কর্মক্ষমতা ঠিকমতো বিচার করতে পারে না। এক গবেষণায় সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি রাতে মাত্র চার বা ছয় ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ দেওয়া হয়। দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে তাদের চিন্তাশক্তি ও মনোযোগ কমতে থাকে। অথচ দুই সপ্তাহ পরও তারা নিজেদের সামান্য ঘুমঘুম ভাব ছাড়া তেমন কোনো সমস্যা বুঝতে পারেননি।

গবেষণাটির সহ-লেখক ও ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির ঘুমবিষয়ক গবেষক হান্স ভ্যান ডংগেন বলেন, ঘুমের অভাবে কর্মক্ষমতা কমলেও মানুষ সেই দুর্বলতা বুঝতে পারে না। ফলে নিজের কাজের মান যে খারাপ হচ্ছে, তা তার অজানাই থেকে যায়।

তবে গবেষণায় এটাও দেখা গেছে, কিছু মানুষ অন্যদের তুলনায় ঘুমের অভাব বেশি সহ্য করতে পারেন। তাই কে সত্যিই কম ঘুমিয়ে সুস্থ থাকছেন, আর কার নিজের কর্মক্ষমতার অবনতি হচ্ছে তা নির্ধারণ করা সহজ নয়।

বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে জিনগত গবেষণার মাধ্যমে এই দুই ধরনের মানুষের পার্থক্য শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে যাদের কম ঘুমের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তাদেরও চিহ্নিত করা যাবে।

নিউজওয়ান২৪.কম/গাজী Newsone24.com/Gazi

লাইফস্টাইল বিভাগের সর্বাধিক পঠিত