ঢাকা, ০৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
সর্বশেষ:

সিরিয়ায় যুদ্ধ বন্ধে শান্তিকামীদের আশা ভেঙে গেছে

হাসানুল কাদির

প্রকাশিত: ১২:৫২, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১২:৫৩, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

সিরিয়ায় সাত বছর ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধ হচ্ছে। অন্তত জটিল হচ্ছে না। এই যখন আশাবাদ দেখা যাচ্ছিল এবং অনেকে এমনটি অনুমানও করেছিলেন, ঠিক তখনই ভূমধ্যসাগরের আকাশে সিরীয় ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি রুশ গোয়েন্দা বিমান ভূপাতিত হয়। এ ঘটনায় শান্তিকামীদের আশা ভেঙে গেছে। কারণ, বিশ্লেষকেরা এরই মধ্যে মন্তব্য করেছেন, সিরিয়ায় চলমান যুদ্ধ আরও জটিল হয়ে ওঠবে। ইসরায়েলের বোমারু মনে করে সিরিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিট এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করলে সেটি গিয়ে রুশ বিমানকে আঘাত করে।

লক্ষ্য করার বিষয় হলো, এমন একটি দিনে এই রুশ বিমান ভূপাতিত হয়, যেদিন রাশিয়ার পর্যটননগরী সোচিতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগানের মধ্যে তুরস্কের ইদলিব প্রদেশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় চেচেন, উইঘুরসহ একটি মুসলিম গ্রুপ এবং অন্য বিদেশিদের পাশাপাশি সিরিয়ার উগ্রবাদীদের নিরস্ত্র করার ব্যাপারে সমঝোতা চুক্তি হয়।

২০১১ সালে সংস্কারের কথা বলে সিরিয়ায় যে বাইরের হস্তক্ষেপের সূচনা হয়েছিল, এখন তার বিস্তার ঘটেছে। দিন দিন তা বাড়ছেও। রাশিয়া সিরিয়ার দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলে ইসরায়েল অধিকৃত গোলান এলাকার কাছে সামরিক পুলিশ মোতায়েন করেছে। ইহুদি ইসরায়েলিদের উসকে দেবেÑইরানি এবং ইরানপন্থী জঙ্গিদের এমন যেকোনো আচরণ প্রতিহত করতে এই সামরিক পুলিশ মোতায়েন করা হয় বলে রাশিয়ার দাবি। পুতিনের দেশ রাশিয়া একসময় সিরিয়ায় ইরানের উপদেষ্টাদের ওপর ইসরায়েলের বিমান হামলা বিষয়ে ইসরায়েলের পক্ষে সাফাই গেয়েছিল। এখন রুশ বিমান ভূপাতিত করার পর তারা সেই ইসরায়েলের প্রতি প্রচ- ক্ষুব্ধ।

তুরস্ক ও রাশিয়া দেশ দুটির পারস্পরিক সম্পর্ক বহুমুখী। তা-ও সমানতালেই। ইদলিবসহ সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের ভূখ-ে মুসলিম দেশ তুরস্কের নিয়ন্ত্রণের নিন্দা জানিয়ে আসছে রাশিয়া। একই সঙ্গে সিরিয়ার শহরগুলোয় তুলনামূলক স্থিতিশীলতা ও শান্তিরক্ষায় তুরস্কের উপস্থিতি জরুরি মনে করে সমর্থনও করছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন সিরিয়ার জনগণকে রক্ষার কথা বলছেন। আবার বিদ্রোহ দমনের নামে ইদলিব শহরে বিমান হামলাও চালাচ্ছে তার দেশ রাশিয়া, যাতে নিহত হচ্ছে বেসামরিক সাধারণ লোকজন। সোচির সমঝোতা চুক্তি বাস্তবায়ন হবে কি না, তা এখন দেখার বিষয়। এর আগেও উদ্যোগ নেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান আন্তরিকতা সত্ত্বেও নানা প্রতিকূলতার কারণে সিরিয়ায় কাক্সিক্ষত শান্তি প্রতিষ্ঠায় সফলতা অর্জন করতে পারেননি। যেকোনো বিষয়ে একপক্ষের শত আন্তরিকতার দৌড়ে অন্যদের বিরোধিতায় চাইলেও কি কোথাও কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে সহজে পৌঁছা সম্ভব হয়? তুরস্কও সম্ভবত এখানেই ব্যর্থতার সাগরে হাবুডুব খাচ্ছে।

দ্য গার্ডিয়ান-এর বিদেশ সাংবাদিক জনাথন স্টিল লিখেছেন, সিরিয়ায় এই যুদ্ধের জন্য পশ্চিমা সরকারগুলোই মূলত এবং প্রধানত দায়ী। ২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট আসাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও আমেরিকা উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তারা চরমপন্থীসহ যুদ্ধরত বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে সাহায্য ও অর্থায়ন করেছে। যুদ্ধবিরতির জন্য তাদের আহ্বান বেসামরিক লোকজনকে নয়, বরং বিদ্রোহীদের সাহায্য করার জন্যই। সাধারণ লোকজনকে রক্ষায়, দেশটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে স্থিতিশীলতা রক্ষায় কোনোও পশ্চিমা সরকার এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। অথচ আরও আগেই তাদের এ নিয়ে কাজ করার দরকার ছিল।

ইদলিবে ২০ লাখ বা তার চেয়ে বেশি বেসামরিক লোককে সুরক্ষা দেওয়ার ভালো উপায় আছে। এদের অনেকে অস্থায়ী শিবিরে বা এর চেয়েও খারাপ জায়গায় আছে। সিরিয়ায় একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হওয়া দরকার, যার অধীনে বিদ্রোহীরা আত্মসমর্পণ করবে। সিরীয় সরকার গত দুই বছরে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে ১০০টিরও বেশি আত্মসমর্পণ চুক্তি নিয়ে কথা বলেছে। ‘রিকনসাইলেশন এগ্রিমেন্টস’ নামে এসব চুক্তির আওতায় অবরুদ্ধ এলাকাগুলো থেকে বিদ্রোহীদের সরে যাওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়। এদের বেশির ভাগই ইদলিবে সরে গেছে। সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সিরীয় বাহিনী বিদ্রোহীদের এমনকি রাইফেল ও অন্যান্য অস্ত্র সঙ্গে নেওয়ার অনুমতি দেয় এবং সরকারি বাসে করে তাদের নিয়েও যাওয়া হয়। সশস্ত্র যোদ্ধাদের সঙ্গে তাদের পরিবারের হাজার হাজার সদস্য ও অন্যান্য বেসামরিক লোকও যায়। ফলে ইদলিব এখন বাস্তুহারা লোকজনে ঠাসা। সিরিয়ার যুদ্ধ কখনোই শুধু আসাদসমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে সাধারণ যুদ্ধ ছিল না। বাইরের দেশগুলো বিশেষত ইরান এবং পশ্চিমা দেশগুলো এই যুদ্ধকে তাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে এবং এখনও তারা তাই করছে। রুশ বিমানগুলো এখন ইদলিবের বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে লিফলেট ফেলছে। যারা এসব লিফলেট তুলছে এবং লোকজনের মাঝে বিতরণ করছে, তাদের বিদ্রোহীরা শাস্তি দিচ্ছে। লিফলেটে বলা হচ্ছে, অর্থহীন এই যুদ্ধ করার চেয়ে শান্তি স্থাপন করাই ভালো হবে। বিদ্রোহীরাও এর পাল্টা বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে, যে আত্মসমর্পণ করবে হোক সে বিদ্রোহী যোদ্ধা বা সাধারণ নাগরিক, তাদের সিরীয় বাহিনী হত্যা করবে।

সিরীয় কর্তৃপক্ষ আত্মসমর্পণ করা বিদ্রোহীদের হত্যা করবে-এ ধরনের ধারণা কোনো অর্থ বহন করে না। আবার এমন আশঙ্কার কথা উড়িয়েও দেওয়া যায় না। সার্বিক বিবেচনায় সিরীয় সরকারকে এখনই খুব জোরে এবং স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিতে হবে, ইদলিবের আত্মসমর্পণকারী বিদ্রোহীরা সবাই সাধারণ ক্ষমা পাবে। প্রেসিডেন্ট বাশারেরই সিরিয়ানদের এ ঘোষণা শুনিয়ে দিতে হবে। বাস্তবেও তা প্রমাণ করতে হবে। তাহলেই আশা করা যায়, তুরস্ক এবং রাশিয়ার মধ্যে দেশটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় যে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, তা পজেটিভ পথে হাঁটতে শুরু করবে। খুব দ্রুত যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে শান্তির পায়রাও ওড়াওড়ি করতে দেখা যাবে। ইরান কি সেক্ষেত্রে বাশারকে বাধা দিবে? সেটিই এখন দেখার বিষয়।

পশ্চিমা সরকারগুলোর এটা মানতে খুব কষ্ট হবে, সাত বছর ধরে যুদ্ধের পর শেষ পর্যন্ত আসাদই বিজয়ী হচ্ছেন। তাদের এটা মানতেও কষ্ট হবে, রাশিয়ার হস্তক্ষেপের ফলে এই যুদ্ধের অবসান হয়েছে। যেহেতু এই যুদ্ধের জন্য তারাও মূলত দায়ী, তাই পশ্চিমা সরকারগুলোর উচিত এখন সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করা। যে শান্তির পতাকা নিয়ে প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান এখন আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু করেছেন। আমরাও যুদ্ধবিধ্বস্থ মুসলিম রাষ্ট্র সিরিয়ার সর্বত্র অবিলম্বে শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল পরিবেশ দেখতে চাই। সেটা যে বা যার হাত ধরেই বাস্তবায়ন হোক।

হাসানুল কাদির: সাংবাদিক ও চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার (সিইও), রেডগৃন

নিউজওয়ান২৪/এমএস

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত