ঢাকা, ০৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
সর্বশেষ:

রোহিঙ্গাদের সমস্যা রাজনৈতিক, সামরিক সমাধান অসম্ভব: প্রধানমন্ত্রী

ডেস্ক নিউজ

প্রকাশিত: ০২:৩৯, ৯ ডিসেম্বর ২০১৬   আপডেট: ১১:৩৮, ১১ ডিসেম্বর ২০১৬

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা       -ফাইল ফটো

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা -ফাইল ফটো

রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রসঙ্গ একটি ‘রাজনৈতিক সমস্যা’ যার সমাধান ‘সামরিক কায়দায়’ সম্ভব নয়। বাংলাদেশে মিয়ানমার থেকে আসা সেদেশের সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণ ও তাদের নিজেদের দেশে নির্যাতনের শিকার হওয়া প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ মন্তব্য করেন।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে ডেনমার্কের নয়া রাষ্ট্রদূত মিকায়েল হেমনিড ভিনটারকে সৌজন‌্য সাক্ষাত দেওয়ার সময়ে প্রধানমন্ত্রী তাকে একথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম পরে সাংবাদিকদের উল্লেখিত সাক্ষাৎ সম্পর্কে বিস্তারিত জানান।

প্রেস সচিব জানান, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পরিস্থিতি বাংলাদেশ সরকার যেভাবে সামলাচ্ছে, তার প্রশংসা করেছেন ডেনমার্কের নয়া রাষ্ট্রদূত। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রদূতকে বলেন, ‘ইট ইজ এ পলিটিক‌্যাল প্রবলেম, ইট ক‌্যান নট বি রিজলভড মিলিটারিলি’।

তৃতীয় পক্ষের সাহায্য ছাড়া মিয়ানমারকেই সমাধান করতে হবে

এসময় রাষ্ট্রদূতকে শেখ হাসিনা বলেন যে তিনি রিফিউজি সমস্যা সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত। কেননা পঁচাত্তরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তাকেও দীর্ঘ ছয়টি বছর রিফিউজি হিসেবেই প্রবাসে কাটাতে হয়।

এছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তার উদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির অভিজ্ঞতার উল্লেখ করে বলেন, এটা তৃতীয় কোনো পক্ষের সাহায্য ছাড়া মিয়ানমারকেই স্থানীয় পর্যায়ে এর সমাধান করতে হবে।

শান্তিচুক্তির ফলে ১৯৯৭ সালে শান্তিবাহিনীর অস্ত্র সমর্পণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

পার্বত্য চট্টগ্রামে তার সরকার গৃহীত বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পার্বত্যাঞ্চলের জনগণ এখন অন্য সব সুবিধার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলার সুযোগ এবং ইন্টারনেট সুবিধা ভোগ করছে।

রোহিঙ্গারা একসময় স্বাধীন ছিল

বার্মা তথা মিয়ানমারে রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়ে গত শতকের ৮০ এর দশক থেকে এখন পর্যন্ত কয়েক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী নিজ দেশ ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। তাদের ফিরিয়ে নিতে বার বার আহ্বান জানানো হলেও মিয়ানমার কার্যকর সাড়া দেয়নি।

উল্লেখ্য, রোহিঙ্গাদের আবাসভূমি আরাকান এক সময় স্বাধীন ছিল। অষ্টাদশ শতকের শেষভাবে বার্মার রাজা ওই এলাকা দখল করে নেয়। আরাকানে জাতিগত বিভেদ তখন থেকেই।

গত শতকের চল্লিশের দশকের পর আরাকানে বৌদ্ধ মগ ও রোহিঙ্গা মুসলমানদের মধ্যে একের পর এক জাতিগত দাঙ্গা লেগেছে বহুবার। দেশটিতে অর্ধশতাব্দীকালের সামরিক শাসনে আরকানে চলেছে দফায় দফায় দমন অভিযান। দমন নির্যাতনের ধারবাহিকতায় রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ বিচ্ছিন্নতাবাদী তথা স্বাধীন হওয়ার আন্দোলনের পথেও যায়।

সু কির সরকারের অযৌক্তিক দাবি
এরই ধারাবাহিকতায় গত অক্টোবরে চেকপোস্টে হামলায় ৯ সীমান্ত পুলিশ নিহত হওয়ার পর বার্মিজ সেনাবাহিনী এবং সীমান্তরক্ষী পুলিশ একযোগে রোহিঙ্গাদের নির্মূলে নামে। তারা শতাধিক রোহিঙ্গাকে নির্মমভাবে হত্যা করে, তাদের নারীদের ওপর চালায় গণধর্ষণ। প্রাণ বাঁচাতে এরই মধ্যে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা সীমান্তে বিজিবির কড়া টহল সত্ত্বেও বাংলাদেশ চলে আসে। তাদের মধ্যে আছে অনেক ধর্ষিত নারী। বাংলাদেশ অনিচ্ছা সত্ত্বেও একান্ত মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দেওয়ার কথা জানায়।

তবে অনেক রোহিঙ্গা বোঝাই ট্রলার-নৌকা ফিরিয়েও দেয় বিজিবি।

কিন্তু নাফ নদী পেরিয়ে নতুন করে মিয়ানমার থেকে শরণার্থীর স্রোত বাংলাদেশে বইতে শুরু করেছে, তা থামতেই যেন চাচ্ছে না- কারণ আরকানে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মমতা সব সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের এক কর্মকর্তার মতে শঅন্তিতে নোবেল জয়ী সু কির শাসনাধীন মিয়ানমার তার ভূখণ্ড থেকে রোহিঙ্গা মুসলিমদের উৎখাতে জাতিগত শুদ্ধি অভিযান চালাচ্ছে।

তবে বিশ্ব জনমত, স্যাটেলাইটচিত্র এবং অতি সম্প্রতি বাংলাদশে আশ্র্রয় নেওয়া করুণ বাস্তবতার বিপরীতে সু কির সরকারের দাবি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ আকর্ষণের জন‌্য রোহিঙ্গারা নিজেরাই নিজেদের ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে।

ডেনিশ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার রাতে সংসদে আলোচনায়ও রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

নিবন্ধিত ৩০ হাজার অনিবিন্ধিত কয়েক লাখ

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের এখানে ৩০ হাজার নিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছে। কিন্তু অনিবন্ধিত আছে কয়েক লাখ। আমাদের ছোট দেশ, এখানে যদি এভাবে রোহিঙ্গা আসে, সেটা হবে আমাদের জন্য বিরাট বোঝা।

তারপরও নানা ফাঁক-ফোকর গলে বাংলাদেশে ঢুকে পড়া রোহিঙ্গাদের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সরকার করছে বলে সংসদকে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

অপরদিকে, ডেনিশ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে শরণার্থী সঙ্কট প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ পরিবারের সদস‌্যরা নিহত হওয়ার পর ছয় বছর নিজের নির্বাসিত জীবনের কথা স্মরণ করেন।

বৈঠকে রাষ্ট্রদূত জানান, বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সহযোগী হতে পেরে তার দেশ গর্বিত যা ভবিষ্যতে অব্যাহত থাকবে।

ইহসানুল করিম জানান, রাষ্ট্রদূত জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দুই দেশের সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন।

এসময় প্রধানমন্ত্রী জানান, তৃণমূলের উন্নয়ন নিশ্চিত করাই তার সরকারের মূল লক্ষ্য। কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগ করে ডেনমার্ক তাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী ডেনিশ রাষ্ট্রদূতকে জানান, তার সরকার ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে। যে এলাকায় যে ধরনের শিল্পের উপযোগ আছে, সেখানে সেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য কৃষিজমি বাঁচিয়ে শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য নির্দিষ্ট এলাকা ঠিক করা হয়েছে।

নিউজওয়ান২৪.কম/এসএমএম

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত