ঢাকা, ০৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
সর্বশেষ:

বাগালকে ‘ক্রসফায়ারে’ দিলে মিষ্টি বিতরণ হবে!

স্টাফ রিপোর্টার ও হবিগঞ্জ সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ১৯:৫২, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬   আপডেট: ২০:৩৭, ২ মার্চ ২০১৬

চার শিশু হত্যার অন্যতম আসামি নিহত বাচ্চু

চার শিশু হত্যার অন্যতম আসামি নিহত বাচ্চু

সুন্দ্রাটিকি থেকে ফিরে: যদি আব্দুল আলী বাগালকে ‘ক্রসফায়ারে দেওয়া হয়’ তবে গ্রামে মিষ্টি বিতরণ হতে পারে। এই মত সুন্দ্রাটিকি গ্রামের আমজনতার। অপরদিকে, বৃহস্পতিবার ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত বাচ্চুর ‘ব্যাকগ্রাউন্ড ভাল’ বলে স্থানীয় অনেকেই জানান।

কিন্তু ‘ব্যাকগ্রাউন্ড’ ভাল বলেই কি কেউ হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে এবং সেজন্য তাকে অপরাধী বলা যাবে না? কিংবা নিষ্পাপ শিশু একটি দুটি নয়- একসঙ্গে চারজন শিশুকে হত্যায় জড়িত হতে পারে? এমন প্রশ্নে বলা যায় নিহত বাচ্চুর গ্রামের মানুষ এখন দ্বিধাবিভক্ত।

‘বন্দুকযুদ্ধে’ বাচ্চুর নিহত হওয়ার ঘটনাকে সামনে রেখে শুক্রবার হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার সুন্দ্রাকিটি ও আশপাশের গ্রামে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে স্থানীয়দের মতামত। তবে নিহত শিশুদের পরিবারের সদস্যরা ছাড়া কেউই পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।

পেশায় অটোরিকশা চালক বাচ্চুর বিষয়ে কেউ কেউ বলেন, এর আগে সে কোনো অপরাধে যুক্ত ছিল না। হঠাৎ এমন ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে। তবে তারা সঙ্গে সঙ্গে এও বলেন- এত বড় জঘন্য ঘটনায় জড়ানো উচিৎ হয়নি। স্থানীয়দের এমন মনোভাবের প্রতিফলন ঘটেছে যখন বাচ্চুর মরদেহ সুন্দ্রাটিকি গ্রামে দাফনের বিপক্ষে অবস্থান নেয় লোকজন। এমন জঘন্য ঘটনায় জড়িত কাউকে নিজেদের গ্রামে দাফন করতে দিতে চায়নি তারা। পরে অবশ্য ইউএনওর মধ্যস্থতায় তারা সে অবস্থান থেকে সরে যায়।

এদিকে, এরই মধ্যে খবর চাউর হয় যে, র‌্যাবের গুলিতে বাচ্চু নিহত হওয়ার ঘটনায় এলাকায় মিষ্টি বিতরণ হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে শুক্রবার নিউজওয়ান২৪.কমের পক্ষ থেকে সুন্দ্রাটিকি ও আশপাশের এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চারশিশু হত্যার ঘটনায় জড়িত বাচ্চু নিহত হওয়ায় অনেকের মধ্যে সন্তোষ দেখা গেলেও মিষ্টি বিতরণ করার মতো ঘটনা ঘটেনি। তবে কয়েকজন বেশ জোরের সঙ্গেই বলেন, হ্যাঁ, আমরা মিষ্টি বিলাবো- যদি আব্দুল আলী ওরফে বাগাল মিয়াকে ক্রসফায়ারে দেওয়া হয়।

মোটকথা আইনের বইতে আর বিশেষজ্ঞদের মতামতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ বাচ্চু নিহত হওয়ার পক্ষে বিপক্ষে যে মতই প্রকাশ পাক না কেন- বাস্তবে সুন্দ্রাটিকি ও আশপাশের এলাকায় জঘন্য অপরাধীদের ক্রসফায়ারে নিহতের ঘটনাকে সমর্থন করতেই দেখা গেছে সাধারণ মানুষের বৃহৎ অংশকে। আব্দুল আলীকে তারা খারাপ মানুষ হিসেবেই জানে। এই খারাপ মানুষটি এবং তার সব সহযোগীর মৃত্যু কামনা করছে তারা- এটা পরিষ্কার। সেটা আইনের দীর্ঘসূত্রতায় জড়ানো ধারাবাহিকতার মাধ্যমে হোক বা অন্য কোনো উপায়ে- তাতে তারা খুব একটা পরোয়া করছে না। স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আর সামাজিক পরিবেশের বিচারে বিষয়টি এক অর্থে উদ্বেগের। তবে এ মুহূর্তে সুন্দ্রাটিকির বাস্তবতা এটাই।

বৃহস্পতিবারের পরিবেশ
বাচ্চু নিহত হন বৃহস্পতিবার ভোররাতে। এখবর সকালের মধ্যেই এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এসময় সেখানে বিরাজ করছিল সুনসান নীরবতা। সুন্দ্রাটিকির রাস্তাঘাটে দেখা যায়নি তেমন লোকজন। এর সমান্তরালে নিহত শিশুদের বাড়ির সামনের রাস্তায় অবস্থান করতে দেখা গেছে পুলিশ সদস্যদের।

তবে বাচ্চু মারা গেছে- একপর্যায়ে এখবর গ্রামে ছড়িয়ে পড়লে গুটি গুটি পায়ে অনেকেই নিহত শিশুদের বাড়িতে যায় নতুন করে সমবেদনা জানাতে। এসময় সমবেদনা জানাতে আসা এসব মানুষকে সন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্য আসামিদের ফাঁসি দাবি করেন।

নিহত শিশুদের একজনের দাদী মরম চানও শিশুহত্যাকারীদের ফাঁসি দাবি করেন। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, শুনেছি বাচ্চু র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে। এতে আমরা খুশি। তবে আমার অবুঝ নাতিদের যারা হত্যা করেছে তাদের সবারই ফাঁসি চাই।

নিহত শুভর মা পারুল বেগম, তাজেলের মা আমিনা খাতুন ও মনিরের মা সুলেমা খাতুনও সন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, আমাদের সন্তানদের যারা নির্মমভাবে মেরেছে তাদের বিচার যেন তেমনি হয়। তাহলেই আমাদের সন্তানদের আত্মা শান্তি পাবে। নিহত আরেক শিশু ইসমাইলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার মা মিনারা খাতুন সন্তানের বই হাতে নিয়ে কাঁদছেন। তিনি সব হত্যাকারীর ফাঁসি দাবি করেন।

এর সমান্তরালে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত বাচ্চু মিয়ার মা আয়েশা খাতুন অভিযোগ করেন, চার শিশুহত্যা ঘটনার অন্যতম কুচক্রী আবদুল আলীর দলে না ভেড়ায় ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে বাচ্চুসহ তার ভাইয়েরা।

প্রসঙ্গত, চাঞ্চল্যকর চার শিশু হত্যা মামলায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার দুইজন সম্প্রতি আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিতে বলেন, পঞ্চায়েতের বিরোধের জের ধরে বাচ্চু মিয়া এবং তারা মিলে ওই চার শিশুকে হত্যা করেছে।

আগের ঘটনা
১২ ফেব্রুয়ারি বাড়ির পাশের মাঠে খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয় স্কুল ছাত্র চার শিশু। এর হচ্ছে সুন্দ্রাটিকি গ্রামের আবদাল মিয়া তালুকদারের ছেলে মনির মিয়া (৭), ওয়াহিদ মিয়ার ছেলে জাকারিয়া আহমেদ শুভ (৮), আব্দুল আজিজের ছেলে তাজেল মিয়া (১০) ও আব্দুল কাদিরের ছেলে ইসমাইল হোসেন (১০)। নিখোঁজের পাঁচ দিন পর ১৭ ফেব্রুয়ারি গ্রামের ঈসা বিল এলাকায় তাদের বালিচাপা দেওয়া লাশ পাওয়া যায়।

স্থানীয়রা জানান, সুন্দ্রাটিকি গ্রামের দুই পঞ্চায়েত আবদাল মিয়া তালুকদার ও আব্দুল আলী বাগালের পরিবারের মধ্যে চলমান দীর্ঘদিনের বিরোধের বলি হয়েছে ওই চার শিশু। মাসখানেক আগে সীমানা বিরোধ ও গাছ কাটা নিয়ে দুপক্ষে সংঘর্ষ হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে সালিশ বসে।

১৭ ফেব্রুয়ারি নিখোঁজ শিশুদের লাশ উদ্ধারের দিনই স্থানীয় পঞ্চায়েত নেতা আব্দুল আলী বাগাল ও তার ছেলে জুয়েল মিয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের রিমান্ডে নেওয়া হয়। পরে আদালতে আব্দুল আলী বাগালের আরেক ছেলে রুবেল মিয়ার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বেরিয়ে আসে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের কথা।

১৯ ফেব্রুয়ারি রুবেলের জবানবন্দির বরাত দিয়ে হবিগঞ্জের এসপি জয়দেব কুমার ভদ্র সাংবাদিকদের জানান, স্থানীয় দুই পঞ্চায়েতের বিরোধ ফয়সালা করতে যে সালিশ বসেছিল, সেখানে বাগালের সমর্থক আজিজুর রহমান আরজু মিয়া ও অটোরিকশা চালক বাচ্চু মিয়া ‘অপমানিত’ হয়। এরই প্রতিশোধ নিতে তালুকদার পক্ষের পঞ্চায়েতের শিশুদের হত্যার পরিকল্পনা করে বাগাল গ্রুপ।

পুলিশ জানায়, এরপর সুযোগ বুঝে বাচ্চুর অটোরিকশা ব্যবহার করে গ্রাম থেকে চার শিশুকে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং ওই রাতেই শ্বাসরোধে হত্যার পর লাশ মাটিচাপা দেওয়া হয়। তবে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য পুলিশের গাফলতিকেও দায়ী করেন অনেকে।

দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী এ মামলায় এ পর্যন্ত ছয়জন গ্রেপ্তার হয়েছে।

র‌্যাবের বক্তব্য
বৃহস্পতিবারে ভোরের ঘটনা প্রসঙ্গে র‌্যাব-৯ শ্রীমঙ্গলের কোম্পানি কমান্ডার কাজী মনিরুজ্জামান জানান, বাহুবলে চার শিশু হত্যায় জড়িতদের ধরতে র‌্যাব বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায়। এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার রাতে সিলেটের বিশ্বনাথ থেকে শাহেদ নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শাহেদ জানান, রাতেই দেওরগাছ এলাকা দিয়ে বাচ্চু ভারতে পালিয়ে যাবে। বিষয়টি জানার পরে র‌্যাবের আরেকটি দল ওই এলাকায় অভিযান চালায়। এসময় বাচ্চু ও তার সঙ্গীরা গুলি চালালে র‌্যাবের দুই সদস্য আহত হন। এসময় আত্মরক্ষার্থে র‌্যাবও পাল্টা গুলি চালালে বাচ্চু মারা যান। ঘটনাস্থল থেকে একটি নাইন এমএম পিস্তল ও দুই রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।

নিউজওয়ান২৪.কম/সিজেডডি/এসএল

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত