ঢাকা, ১২ জুলাই, ২০২৬
সর্বশেষ:

অ্যালার্জি: মা-বাবার অতিসাবধানতা শিশুকে রোগপ্রতিরোধে দুর্বল করে!

স্বাস্থ্য ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬:০৪, ৩১ জুলাই ২০১৬   আপডেট: ১৩:৩০, ২২ আগস্ট ২০১৬

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

সোমা যখন দুধ বা দুধজাতীয় কোনো খাবার খায় তখনি তার শরীরে খুজলির উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে। মুস্তাফিজ যখন তরমুজ খায় তখন তার সারা শরীর জুড়ে লাল লাল চাকা চাকা হয়ে ফুলে উঠতে থাকে কিংবা দেখা দেয় বমি। লিসার এমনিতে কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা নেই। কিন্তু বাড়িঘর সাফসাফাই বা ঘর ঝাড়মুছের সময়ে কিংবা যদি একটু ধুলোবালি ওড়ে তখনি শুরু হয় নাক-চোখ দিয়ে পানি পড়া, এর সঙ্গে দেখা দেয় স্বাসকষ্ট।

এটা এক আজব স্বাস্থ্য সমস্যা! এর বিস্তার দিন দিন বাড়ছে অর্থাৎ এর দ্বারা পীড়িতের সংখ্যা বেড়েই চলছে।

কারও হয় বিশেষ কোনো খাবারে, কারও হয়তো কোনো সুগন্ধি বা ঘ্রাণে, কারও বিড়াল বা কুকুর দেখলেই এই সমস্যাটি দেখা দেয়। সমস্যাটি খুবই কমন- অ্যালার্জি! আরও নানান জানা-অজানা কারণে অ্যালার্জি দেখা দিয়ে থাকে। নিউজওয়ান২৪.কমের পাঠকদের জন্য পরিচিত কিছু অ্যালার্জির কারণ এবং এর থেকে পরিত্রাণের উপায় বর্ণনা করা হলো

যখন আমাদের দেহযন্ত্র কোনো বিষয় বা বস্তুর সংস্পর্শে মাত্রাতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখায়- তখন তাকে অ্যালার্জি বলা হয়। যে কোনো খাবার, পোষা প্রাণী, সুগন্ধি, ধোঁয়া, ধূলাবালি, আবহাওয়ার পরিবর্তন, কোনো ধরনের ফুল-ফল-সব্জির প্রভাবে, মশা বা ছারপোকা কামড়ালে, ঔষধ গ্রহণে অর্থাৎ বলা যায় যে কোনো বস্তুর প্রভাবেই হতে পারে অ্যালার্জি।

আমাদের শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা কিছু কিছু বিষয়-বস্তকে গ্রহণে অপারগ হয়। এর প্রতিক্রিয়াটা যে রূপে প্রকাশ পায়- তাই অ্যালার্জি। বিশেষ বিশেষ খাদ্য বা ঐষধ গ্রহণ কিংবা সুগন্ধির পরশ বা পশুপাখির স্পর্শের পর দশ থেকে ত্রিশ মিনিটের মধ্যে নাক-চোখ-শরীর ফুলে যাওয়া, শরীর জুড়ে চাক চাক দেখা দেওয়া এবং সঙ্গে চুলকানি, কখনো স্বাসকষ্ট, বমিভাব কিংবা একেবারে জ্বর চলে আসা- এসবই সেইসব প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ।

যদিও অ্যালার্জি মারাত্মক বা জীবনঘাতি কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি করে না, তবে- অ্যালার্জি প্রায় ক্ষেত্রেই অসহনীয়। এটা জীবনকে অসহ্যকর যন্ত্রণায় ফেলে দেয়- অনেক ক্ষেত্রে অনিচ্ছায়ই পড়তে হয় অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, গ্রামে বসবাসকারীদের চেয়ে শহরওয়ালাদের অ্যালার্জির সমস্যা বেশি। এছাড়া যেসব শিশুদের অতিমাত্রায় সাফ-সুতরো পরিবেশে প্রতিপালন করা হয়- তাদের অ্যালার্জিটাও বেশি দেখা দেয়। এর কারণটা হলো বেশিমাত্রায় রক্ষণশীলতার কারণে তাদের দেহের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বিকাশ পুরোমাত্রায় ঘটে না। এক্ষেত্রে জানার আরও একটা বিষয় হচ্ছে- বড়দের চেয়ে বাচ্চাদের অ্যালার্জির সমস্যাটা বেশি হয়।

শিশুদের জন্য
বিশেষ করে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা স্বাভাবিক করতে বা বাড়াতে হলে তাদেরকে চার দেয়ালে বন্দি রাখা চলবে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন- আপনার শিশুকে, ধুলা-মাটি আর রৌদ্রেও খেলতে দিতে হবে, ভিজতে দিতে হবে বৃষ্টিতেও। প্রাকৃতিক এসব বিষয় আপনার শিশুকে রোগশোকের সঙ্গে লড়তে পারঙ্গম করে তুলবে- অর্থাৎ সক্ষম আর শক্তিমান হয়ে উঠবে তার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

তবে হ্যাঁ, খেলাধুলার পর সে ঠিকঠাক মতো গোসল করলো কিনা বা মুখ-হাত ধুয়ে নিলো কি না তা আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে এসূত্রে চমকপ্রদ আরও একটা বিষয় জানা গেছে- তা হলো, সাবধানতার বিচারে যেসব জিনিস থেকে আমরা বাচ্চাদের কড়াকড়িভাবে দূরে রাখতে চাই- এই ‘দূরে রাখাটাই’ আপনার বাচ্চাকে আরও অসুস্থ করে তুলতে পারে।

খেলতে দিন তাকে রোদ-বৃষ্টি ধুলোবলিতে

আমরা পানির ফিল্টার আর তেল-সাবানওয়ালাদের বিজ্ঞাপনী সাবধানবাণীতে প্রভাবিত হয়ে বাচ্চাদের ইনফেকশন থেকে বাঁচাতে বাড়িতে-আঙ্গিনায় বা মাঠে খেলাধুলা করতে দেই না, ধুলোমাটিতে লুটোপুটি করতে দেই না, বৃষ্টির পানিতে ভেজার অনিন্দ্য স্বাদ আস্বাদন করতে দেই না! আপনার জানা উচিৎ- আমাদের এই আচরণটা আসলে একটা রোগের লক্ষণ যাকে বলে হাইজিন হাইপোথিসিস। আমাদের এই অতিসচেতনতার হাইজিন হাইপোথিসিসের কারণে বাচ্চারা রোগ প্রতিরোধে অপেক্ষাকৃত দুর্বল এবং অনেক ক্ষেত্রেই ফার্মের মুরগির মতো অলস প্রকৃতির হয়ে বড় হয়ে উঠছে।

আগ্রহোদ্দীপক আর চমকানো ঘটনা আরও আছে। যেসব বাচ্চাদের ভ্যাকসিনেশন করানো হয় নাই অর্থাৎ বিভিন্ন রোগশোকের টীকা কম দেওয়া হয়েছে বা দেওয়া হয়-ই নাই- দেখা গেছে এ ধরনের বাচ্চাদের অ্যালার্জিও কম হয়।

ভ্যাকসিনেশনের কারণে তারা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ থেকে বেঁচে গেলেও তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। আর তাই, যা কিছু শরীরের বিরাজমান রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সামনে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বা অচেনা মনে হয়- সে তারই বিরুদ্ধাচরণ শুরু করে। ফলশ্রুতিতে সে তার নিজের কায়দায় ওই জিনিসগুলোকে শরীর থেকে বের করে দিতে চায়। সেটাই দেখা দেয় অ্যালার্জি হয়ে- কখনো শরীরে চাকাচাকা ফুলে যাওয়া, স্বাসকষ্ট, জ্বর, বমিভাব ইত্যাদি রূপে এর প্রকাশ ঘটে।

খেয়াল রাখুন বাবা-মার দিকে

শিশুদের সমান্তরালে বৃদ্ধদেরও অ্যালার্জির প্রকোপ দেখা দেয়- কারণ, বয়সের ভারে তাদেরও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে আসে। বিশেষ করে ঋতু পরিবর্তনজনিত সর্দিকাশি ধরা থেকে তাদের সাবধানে রাখতে হবে। এমন সময়ে আপনার বৃদ্ধ বাবা-মার দিকে বিশেষ নজর রাখুন।

কারও কারও ক্ষেত্রে অ্যালার্জি বংশগতও হয়ে থাকে। বাবা-মার যদি ধুলামাটি বা অন্য কোনো কিছুতে অ্যালার্জি থেকে থাকে তবে সন্তানদেরও সমস্যা দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রেও লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে- বাচ্চাদেরও যে বাবা-মার মতো একই জিনিসে অ্যালার্জি হবে তা কিন্তু নয়। তাদের অন্য বিষয়ে অ্যালার্জি হতে পারে। এমনও দেখা গেছে, মায়ের ছিল ধুলাবালিতে অ্যালার্জি আর তার সন্তাদের অ্যালার্জি হয়েছে সুগন্ধিতে।

যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ উন্নত দেশগুলি কোনো কোনোটিতে অ্যালার্জি আক্রান্তের সংখ্যা ৪০%-এর বেশি। সেই বিচারে আমাদের দেশে এই সংখ্যা এর অর্ধেক বা তার চেয়ে একটু বেশি হতে পারে। এটা একটা ভাল দিক। এর আরেকটা অর্থ হচ্ছে- আমাদের অ্যালার্জি তথা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তাদের চেয়ে বেশি।

প্রতিরোধের উপায়!
তথ্য প্রবাহের এই রমরমা সময়েও আমাদের দেশে অ্যালার্জি বিষয়ে জানাশোনাটা সাধারণ মানুষের মাঝে বেশ কমই বলা যায়। বারবার অসুস্থ হয়ে পড়া লোকজনের বেশিরভাগই জানেন না যে এর পেছেনের কারণটা হতে পারে নিজের খাওয়া দাওয়া বা মৌসুম পরিবর্তনজনিত প্রভাব। এধরনের ক্ষেত্রে যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ তো নিবেনই আর যখন বুঝতে পারবেন কোন জিনিসটার কারণে এমন হচ্ছে তখন ওই খাদ্য বা বস্তুর ব্যাপারে পরবর্তীতে সাবধান হয়ে যাবেন।

অ্যালার্জি থেকে বাঁচার প্রধান কৌশলই হচ্ছে একে প্রতিরোধ করা। যাদের ধুলাবালিতে অ্যালার্জি আছে তারা বাইরে বের হওয়ার সময়ে মুখে রুমাল বা মাস্ক পরার অভ্যাস করুন। এতে উপকার পাওয়া যায়। ঘ্রাণ বা গন্ধে যাদের অ্যালার্জি তাদের জন্য বাড়ির পাকঘরে অ্যাগজস্ট ফ্যান লাগানো এবং রান্নার সময় তা চালু রাখা জরুরি।

ধুলাবালি বা দুর্গন্ধে অ্যালার্জির শিকারদের আরেকটি সমস্যা কাঁথা-বালিশ-চাদর। এগুলো নিয়মিত বদলাতে হবে এবং পরিষ্কার রাখতে হবে।

আপনার ঘরদোর হামেশা বন্ধ-বাক্স করে রাখবেন না। দরোজা-জানালা খুলে ভেতরে আলো-বাতাস আসতে দিন। আর আলো-বাতাসের সঙ্গে যেন মশা-মাছি না আসতে পারে সেজন্য আর্থিক সঙ্গতির বিবেচনায় দরোজা-জানালায় নেট বা জাল (প্লাস্টিক বা ধাতব) ব্যবহার করুন।

ঘরে বা বারান্দায় মাকড়শার জাল, ঝুল থাকলে তা পরিষ্কার করুন। এই জাল বা ঝুল থেকেও অনেকের অ্যালার্জি হয়।

চিকিৎসা
অ্যালার্জির চিকিৎসা অ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, ইউনানি-আয়ুর্বেদি এমনকি ন্যাচারোপ্যাথিতেও সম্ভব। যার যেভাবে সম্ভব, তিনি সেভাবে সেকায়দায় চিকিৎা নেবেন। তবে যে পথেই যান না কেন- কিছু কমন এবং উপকারী বিষয় চেষ্টা করতে পারেন চিকিৎসা শুরুর আগে। এগুলো হচ্ছে- অতিরিক্ত গরম বা ঠাণ্ডা পানি না খাওয়া এবং টকজাতীয় ও ঠাণ্ডা খাবার পরিহার করা। এছাড়া রোজ সকালে এক গ্লাস লেবুপানি উপকার দিতে পারে।

খাওয়া-দাওয়ার বিষয়ে অ্যালার্জি থাকলে হোমিওপ্যাথিতে ন্যাট্রাম মিউর প্রেসক্রাইব করা হয়। বয়স্কদের জন্য সকাল-সন্ধ্যা দুই বেলা পানিতে মিশিয়ে চার ফোঁটা করে নেওয়া যেতে পারে এই দাওয়াই। তবে বাচ্চাদের জন্য ডোজ কম হবে।

অ্যালোপ্যাথিতে সাধারণত অ্যাভিল বা সেট্রিজিন জাতীয় ঔষধ গ্রহণ করে উপকার পাওয়া যায়। তবে এসব স্বল্পকালীন অর্থাৎ ২/৩ ঘণ্টার জন্য কাজে দেয়। লম্বা সময় ধরে কষ্ট দিচ্ছে- এমন অ্যালার্জির জন্য ইমমিউনো থেরাপির প্রয়োজন পড়ে। রোগীর অবস্থা বেশি খারাপ হলে বা এমন কোনো বিষয় অ্যালার্জি দেখা দিলে যা এড়ানো তার পক্ষে সম্ভব নয়- সেক্ষেত্রে এই ব্যবস্থার দরকার হয়।

এই থোরাপির প্রভাব লম্বা সময় ধরে থাকে রোগীর ওপর। কখনো কখনো দেখা গেছে একবার এই থেরাপি নিলে ৩/৪ বছর পর্যন্ত অ্যালার্জি মুক্ত থাকা যায়। তবে এটা ব্যয়বহুল।

অ্যালার্জি আর হাঁপানি কি এক?
অনেকগুলো বিষয় কমন হলেও অ্যাজমা (হাঁপানি) আর অ্যালার্জি দুটি আলাদা বিষয়। তবে আজকাল অনেক বিশেষজ্ঞের মতে- অ্যাজমাও একধরনের অ্যালার্জি। যখনি শরীর তার অ্যালার্জিওয়ালা বিষয়বস্তুর সংস্পর্শে আসে তখনি অ্যাজমা ধরে বসে- এটাকে বলে অ্যালার্জিক অ্যাজমা। অ্যাজমা আর অ্যালার্জির সম্পর্ক আরও একটা আছে। ধরুন, কারও অ্যালার্জিক অ্যাজমা নেই- কিন্তু শুধু অ্যালার্জি আছে। এ ধরনের ক্ষেত্রে অ্যাজমায় ধরার সম্ভাবনা ৪০% বেড়ে যায় তার।

নিউজওয়ান২৪.কম/একে

লাইফস্টাইল বিভাগের সর্বাধিক পঠিত