ঢাকা, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
সর্বশেষ:
আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন ডিসেম্বরে হেল্পলাইন ১৬২৬৩ এ কল করলেই ডাক্তারের পরামর্শ ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে একটি সমন্বিত পদক্ষেপ খুবই জরুরি

সৎ পথে চলাটা পাপ হিসেবেই গণ্য করা হয় বোধহয়

মুহাম্মদ সাইদুজ্জামান আহাদ  

প্রকাশিত: ১৮:৩৫, ২৯ নভেম্বর ২০১৮  

ছবি সংগৃহীত

ছবি সংগৃহীত


তাকে সরিয়ে দেয়ার জন্যে হাজার রকমের অপচেষ্টা চালানো হয়েছে এর আগেও। ওপরের মহলে তদবির করা হয়েছে অজস্রবার, বদলির আদেশ আসার পরেও সেটা প্রত্যাহার করা হয়েছে, এমন ঘটনাও তো ঘটেছে এর আগে। ক্রমাগত তাকে হুমকি দেয়া হয়েছে, কিছুতেই যখন তাকে থামানো যাচ্ছিল না, তখন তার মাথার ওপরে সিলিং ফ্যান খুলে পড়েছে, পেছনে কাদের হাত ছিল সেটা অনুমান করতে কষ্ট হয় না৷ বানসুরী মোহাম্মদ ইউসুফ নামের এই মানুষটার একটাই অপরাধ, তিনি বাড়াবাড়ি রকমের সৎ। 

বিমানবন্দরের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী আর ব্যবসায়ীদের কাছে যমের আরেক নাম তিনি৷ আর একারণেই একটা গোষ্ঠী তাকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ারপোর্ট ম্যাজিস্ট্রেটের পদ থেকে সরিয়ে দিতে উঠেপড়ে লেগেছে৷ এখন তো তাকে বদলি করার জন্যে মোটামুটি চাঁদাবাজি করেই তহবিল সংগ্রহ করা হচ্ছে!

তিন বছর আগে শাহজালাল বিমানবন্দরের এয়ারপোর্ট ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই যাত্রী ভোগান্তি শূন্যের ঘরে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন এয়ারপোর্ট ম্যাজিস্ট্রেটরা। দুই ম্যাজিস্ট্রেটের মধ্যে বানসুরী মোহাম্মদ ইউসুফের প্রতি দুর্নীতিবাজদের ক্ষোভটা একটু বেশি৷ কারণ তিনি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে পছন্দ করেন। যাত্রীর লাগেজ কেন এলো না, সেটা নিয়ে তিনি মাথা ঘামান, জরিমানা করেন এয়ারলাইন্সকে; বিমানের ফ্লাইট দেরী করলেও যাত্রীকে হোটেলে রাখার খরচ আদায় করে দেন। এয়ারপোর্টে একটা সময়ে পনেরো টাকার পানির বোতল চল্লিশ টাকাতেও বিক্রি হতো, সেটা তিনি বোতলের গায়ে লেখা দামেই বিক্রি করার বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছেন৷

হুটহাট তিনি বেশভূষা পাল্টে এয়ারপোর্টের আনাচে কানাচে ছুটে যাচ্ছেন অনিয়ম আর দুর্নীতির খোঁজে। একটা সময়ে লাগেজ থেকে মালামাল খোয়া যাওয়াটা ছিল নিত্যনৈমিত্যিক ঘটনা, এখন সেটাও মোটামুটি নেই বললেই চলে৷ তবুও যদি কখনও এয়ারপোর্টের কোন কর্মচারীর এমন কাজে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, সেই কর্মচারীর জন্যে শাস্তি হিসেবে ‘বই পড়া’র ব্যবস্থা চালু করেছেন ম্যাজিস্ট্রেটরা।

যাত্রীদের কাছে ধীরে ধীরে ম্যাজিস্ট্রেটরা হয়ে উঠেছেন আশা-ভরসার প্রতীক। বিমানবন্দরে কারো কোন সমস্যা হলেই তারা ছুটছেন ম্যাজিস্ট্রেটিদের অফিসে, বানসুরী মোহাম্মদ ইউসুফকে তো অনেকে ভালোবেসে ‘মিয়াভাই’ নামেও ডাকেন! এখন এই মানুষটাকে এয়ারপোর্ট থেকে অন্য কোথাও সরিয়ে দেয়ার জন্যে উঠেপড়ে লেগেছে একটা মহল। হুমকি ধামকি দিয়ে বা ভয় দেখিয়ে যখন লাভ হচ্ছে না, তখন তারা বেছে নিয়েছে অন্য রাস্তা৷ এখন তারা ফাণ্ড গঠন করছে, শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে তাকে অন্য কোথাও বদলি করানোর জন্যে! সেই টাকার পরিমাণও নাকি প্রায় বিশ লক্ষাধিক!

প্রজেক্ট টুকিটাকি, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, এয়ারপোর্ট ম্যাজিস্ট্রেট, অপরাধের শাস্তি বই পড়া

এই গোষ্ঠিটি ইতোমধ্যেই বিমানবন্দরের প্রায় প্রতিটি দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এমনকি এয়ারলাইন্সগুলোর কাছ থেকেও চাঁদা সংগ্রহ করেছে বলে জানা গেছে। এই কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে এক তরুণ ব্যবসায়ী, যিনি কিনা নিজেও বিমানবন্দরের বেশ কয়েকটি দোকানের মালিক। কিছুদিন আগেই তার দোকানে বাসী-পচা খাবার বিক্রির অভিযোগে দোকানের এক কর্মচারীকে এক সপ্তাহের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন এয়ারপোর্ট ম্যাজিস্ট্রেট। সেই ক্ষোভ থেকেই নাকি ওই ব্যবসায়ী উঠেপড়ে লেগেছে ম্যাজিস্ট্রেটকে বদলি করানোর জন্যে৷ তাকে সঙ্গ দিচ্ছে আরও কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ী, ম্যাজিস্ট্রেটের কারণে যাদের দুই নম্বুরি ব্যবসা লাটে উঠেছে!

এর আগেও এভাবে ফান্ড সংগ্রহ করে উপরমহলে বিশেষ সুপারিশ করে বানসুরী মোহাম্মদ ইউসুফকে বদলি করানোর চেষ্টা চালানো হয়েছিল৷ কিন্ত সেবার ট্রান্সফার অর্ডার জারী করা হলেও পরে সেটা স্থগিত করা হয়৷ সেবারও টাকা সংগ্রহের পেছনে এই একই ব্যক্তির হাত ছিল বলে অভিযোগ৷ নিজেকে তিনি কোন এক মন্ত্রীর এপিএস হিসেবে দাবী করে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন, সেই ব্যক্তি কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পত্তির মালিক বলেও জানা গেছে৷ কিন্ত এয়ারপোর্ট ম্যাজিস্ট্রেটদের সামনে সেসব করে পাত্তা না পাওয়াতেই ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে এই পথ বেছে নিয়েছেন তিনি।

বানসুরী মোহাম্মদ ইউসুফ, এয়ারপোর্ট ম্যাজিস্ট্রেট, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, এয়ার এরাবিয়া, যাত্রী হয়রানী

এদেশে সৎ কাজ করা, সৎ পথে চলাটা পাপ হিসেবেই গণ্য করা হয় বোধহয়। নইলে যে মানুষটা হাজার হাজার যাত্রীর ভোগান্তি দূর করে যাত্রীদের কাছে ‘মিয়াভাই’ হয়ে উঠেছেন, অপরাধীদের যিনি বই পড়ার মতো শাস্তি দিয়ে আলোর পথে আনতে চান, যাত্রীরা যার কারণে হারানো লাগেজ সময়মতো জরিমানাসহ ফিরে পায়, সেই মানুষটাকে এয়ারপোর্ট থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্যে কত অপচেষ্টা! কখনও কখনও উর্ধ্বতন কর্তারাও বিক্রি হয়ে যাচ্ছেন টাকার কাছে, তার বদলির আদেশে সই হয়ে যাচ্ছে! এইসব দুর্নীতিবাজ কর্মচারী আর ব্যবসায়ীদের কথা ভাবার লোক এদেশে আছে, অসহায় যাত্রীদের কথা ভাবার কেউ নেই৷

আর যখন একজন বানসুরী মোহাম্মদ ইউসুফ নিজের সর্বশক্তি দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, তখন ষড়যন্ত্র করে তাকেও সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে! এটাই বোধহয় সততার পুরস্কার, ভালো কাজের প্রতিদান। সূত্র : এগিয়ে চলো।

নিউজওয়ান২৪/এমএম