ঢাকা, ০৩ আগস্ট, ২০২০
সর্বশেষ:
সেহরি ও ইফতারের সময় সূচি : ঢাকায় প্রথম রোজার সেহরির শেষ সময় রাত ৪টা ৫ মিনিটে আর ইফতার হবে সন্ধ্যা ৬টা ২৮ মিনিটে। আইইডিসিআর এর করোনা কন্ট্রোল রুম (০১৭০০৭০৫৭৩৭) অথবা হটলাইন নম্বরে (০১৯৩৭১১০০১১, ০১৯৩৭০০০০১১, ০১৯২৭৭১১৭৮৪, ০১৯২৭৭১১৭৮৫, ০১৯৪৪৩৩৩২২২, ০১৫৫০০৬৪৯০১–০৫) যোগাযোগ করা যাবে। এ ছাড়া করোনাসংক্রান্ত তথ্য জানতে বা সহযোগিতা পেতে স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ এবং ৩৩৩ নম্বরে ফোন করা যাবে। অনলাইনে করোনা নিয়ে যোগাযোগ করতে আইইডিসিআরের ই-মেইল [email protected] এবং ফেসবুক পেজে (Iedcr,COVID19 Control Room) যোগাযোগ করা যাবে। জরুরি প্রয়োজনে কল করুন- ৯৯৯

রেডিও

মো. আসাদুল্লাহ

প্রকাশিত: ২০:১৩, ২৬ মার্চ ২০১৯  

আমার শৈশবের স্মৃতি জুড়ে রয়েছে একটা আশ্চর্য রেডিও। স্বাধীনতার প্রায় চার যুগ পরেও ওটার ভেতরের মানুষগুলোর কণ্ঠ, সুর, গান ও কথা শোষণ ও নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার, কিন্তু স্বাধিকারের দাবীতে উচ্চকিত এক বিপন্ন জনপদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় আমাকে। এতো বছর পরেও ইথারে ভেসে আসে প্রতিটা শব্দ বা গান।

১৯৭১ সাল। বর্ষাকাল। আমাদের বাড়ির চারপাশ প্লাবিত। বাড়ির সবচেয়ে উত্তরে দক্ষিণমুখী একটা টিনের চালাঘর। সামনে সংযুক্ত বারান্দা। বারান্দার সামনে বিশাল মাটির উঠোন। অন্দর বাড়ির। বামদিকে তাকালে বাঁশের প্রাচীরের ওপারে সদর বাড়ির উঠোন পেরিয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে বিশাল এক জল মগ্ন প্রান্তর। দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। সুর্যের আলো জলের ওপর থেকে প্রতিফলিত হবার কারণে রুপোর থালার মতো চিক চিক করছে। আমি মনে করতে সক্ষম অথবা স্বপ্নের ভেতরে অবলোকন করতে সক্ষম যে, বারান্দায় বসে আছি আমরা কয়েকজন শিশু। শীতল পাটি বিছিয়ে। আমাদের সামনে কাঠের পিড়ির ওপরে সেই রেডিওটা। উঠোনে ধান শুকোতে দেয়া হয়েছে। উজ্জ্বল রোদে উঠান ভরে আছে। তবে যে কোন মুহূর্তেই ঝিম ঝিম করে বৃষ্টি নামতে পারে।

অদ্ভুত ধরণের ছিলো সেই রেডিও। ওটার পেছন বা কোনা থেকে জিলাপির মতন প্যাঁচানো দীর্ঘ একটা তামার তার ক্রম বর্ধনশীল বৃত্ত বা সৌরলোকের আকৃতি ধারণ করে বারান্দার কোণের একটা কাঠের থামের সাথে আটকে রাখা ছিলো। তারের শেষ প্রান্তটি পাটের রশি দিয়ে বারান্দার টিনের চালের কোণে বেঁধে রাখা হয়েছিলো। রেডিওর পৃষ্ঠদেশে কয়েকটা শুকনো ধান। উঠোন থেকে কুড়িয়ে এনে আমরাই সেখানে রেখেছিলাম। রেডিওতে গান বাজছিলো। মজার ব্যাপার হলো বাতাসের আবেগে অথবা রেডিওর গানের তালে তালে ধান গুলোও নাচছিলো। তবে গানের সুরের চেয়ে ধানগুলোর নৃত্যই আমরা যারা শিশু তাদের জন্যে মূল আনন্দের উৎস ছিলো। আমার মনে আছে আমরাও নাচছিলাম পাটির ওপরে। ধানের স্পন্দন অথবা ইথারে ভেসে আসা গানের তালে তালে! পল্লীগীতি অথবা দেশাত্নবোধক গান ছিলো সেটা। এই স্মৃতিটা এই পঞ্চাশ ঊর্ধ্ব বয়সেও এতোটাই স্পষ্ট আর আনন্দমুখর যে, ওটাকে আমি স্বপ্ন বলে উড়িয়ে দিতে পারি না কোনোভাবেই। এত যুগ পরেও!

রেডিওটার আয়তন ছিলো বর্তমান কালের যে কোন রেডিওর চেয়ে অনেক বড়। আয়তকার চতুষ্কোণ বাক্স। রঙ বর্তমান কালের ফার্ম মুরগীর বাদামী বা লালচে ডিমের মতো। কোন আমলে আমাদের বাড়িতে এর আগমণ ঘটেছিলো তা আমার জানা নেই। সামনের ডান দিকে বিশাল গোলাকার একটা নব। এটাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এর এনালগ স্টেশনগুলো ধরতে হত। যদিও একবার কথা বলা বা গান গাওয়া শুরু করলে রেডিওটা আর থামতে চাইতো না, এর সঠিক স্টেশনগুলো ধরতে পারাটাই ছিল সবচেয়ে বড় দক্ষতার কাজ। আমাদের বড় কাকার ছেলে লেবু ভাইই শুধুমাত্র এই কাজটা সুচারুরূপে করতে সক্ষম হতেন। অবশ্য এই কাজ ছাড়া অন্য কোন কাজ তিনি করতেন বা পারতেন বলে আমার স্মৃতিতে নেই। কারণ তিনি ছিলেন জেঠীর চরম আদরের সন্তান। তাকে শাসন করার মতো কেউই ছিলো না। তিনি মনের আনন্দে সারাদিন রেডিওতে গান শুনতেন।

আমাদের সকল শিশুদের ধৈর্যচ্যুতির কাছাকাছি নিয়ে গিয়ে তিনি একটা একটা করে রেডিও স্টেশন ধরতে সক্ষম হতেন। যতক্ষণ পর্যন্ত টিউনিং তার পছন্দ না হতো ততোক্ষণ তিনি একাধারে নব ঘুরাতে থাকতেন। অনেক সময়ে আধাঘন্টা বা তার চেয়েও বেশী সময় ধরে। তবে রেডিওটার আকর্ষণ ছিলো আমাদের নিকটে দুর্দমনীয়। আমরা সবিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতাম রেডিওর সামনের অংশে তির তির করে করে নড়তে থাকা মেগাহার্টজ দেখানোর লাল রঙের কাঁটাটার দিকে। আমাদের হৃদয়ও উদ্বেলিত হতে থাকতো অস্থির সেই লাল কাঁটার চলাচলের সাথে।

১৯৭১ সালে এই রেডিওটাই যমুনা নদীর তীরের আমাদের প্রান্তিক জনপদে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলো। এই রেডিওতেই আমরা বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ শুনেছিলাম। এই রেডিওতেই চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়া কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে দেয়া স্বাধীনতার ঘোষণা শুনেছিলাম। এই রেডিওতেই আমরা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করার খবর শুনেছিলাম। এই রেডিওতেই মুজিবনগরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠনের কথা শুনেছিলাম। এমনকি এই রেডিওতেই দেশবাসীকে উদ্দেশ্য করে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ঘৃণ্য ইয়াহিয়া খানের দেয়া ভাষণ শুনেছিলাম।

এই রেডিওতেই নির্বিচারে গণহত্যার শিকার বাঙালীদের কর্তৃক মৃত্যুর মুখ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা শুনেছিলাম। এই রেডিওতেই আমরা শুনতাম হাজার দেশাত্মবোধক গান। যেগুলো এতো প্রতিকূলতার ভেতরেও আমাদেরকে উজ্জ্বীবিত করতো। ‘শোন একটি মুজিবের...’, ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি’।

এই রেডিওতেই আমরা শুনতাম ‘চরমপত্র’। প্রবাসী ‘স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্র’ থেকে। রঙ্গ-ব্যাঙ্গাত্মক প্রচার “চরমপত্র” আসলেই বাঙ্গালীদের মনোবল সুদৃঢ় করতে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছিল। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর শিশু, কিশোর, যুবকদের পদভারে আমাদের কাছারিঘরের দহলিজ ভরে যেত। ‘চরম পত্র’ অনুষ্ঠান শোনার জন্যে। এই অনুষ্ঠানের লেখক ও পাঠক ছিলেন এম আর আক্তার মুকুল। তিনি যখন তার আঞ্চলিক উচ্চারণে বলতেন, “ মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীরা কাঁদার ভেতরে হান্দাইয়া গ্যাছে!” সাথে সাথে গ্রামের সকল শিশু, কিশোর-কিশোরী ,যুবক-যুবতী এমনকি অশীতিপর বৃদ্ধ-বৃদ্ধারাও আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠতো।

কখনো কখনো তিনি পাকসেনা, আল বদর, আল সামস, রাজাকারদের দিকে একরাশ ঘৃনা,থু থু মিশ্রিত বিকৃত কন্ঠে উচ্চারণ করতেন , “আইজ ভেড়ামারার কাছে আমাগো বিচ্চু পোলাপাইনরা এমুন মাইর দিচে, কমসে কম তেরজন পাকি সৈন্য প্যাঁকের মধ্যে পইড়্যা কাঁতরাইতাছে”। তখন আমাদের সবার চোখ-মুখ অন্ধকারের মধ্যেও ঝিলিক দিয়ে উঠত।

অথবা কখনো তিনি দরাজ কণ্ঠে বলে উঠতেন, “বর্ষা আগত। সারাদেশ জলমগ্ন হবে। পাকিরা সাঁতার জানেনা। বিচ্ছুরা শুধু ওদের স্পীড বোট ফুটো করে দেবে। তারপরই কেল্লা ফতে। শত শত পাকসেনা ডুবে মারা পড়বে”। তখন পুরো জনপদই আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠত সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় যার জন্যে ইতিমধ্যেই বলিদান হয়েছে লক্ষ লক্ষ প্রাণ। হয়েছে অযুত মা বোনের শ্লীলতাহানি!

‘অপারেশন জ্যাকপট’ ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে অকুতোভয় সদস্যদের নিয়ে সংগঠিত নৌ-সেক্টর কর্তৃক পরিচালিত সফলতম গেরিলা অপারেশন। মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে এই আত্মঘাতী অপারেশন ১৯৭১ সাল এর ১৬ আগস্ট এর প্রথম প্রহরে পরিচালিত হয়েছিল। একযোগে চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্র বন্দর এবং চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরে। ১০নং সেক্টরের অধীনে ট্রেনিং প্রাপ্ত নৌ কমান্ডো যোদ্ধাদের অসীম সাহসিকতার নিদর্শন এই অপারেশন জ্যাকপট। এই গেরিলা অপারেশনে পাকিস্তানি বাহিনীর অনেকগুলো অস্ত্র ও রসদবাহী জাহাজ ধ্বংস করে দেয়া হয়। বড় রকমের ক্ষতিগ্রস্ত হয় অবশিষ্টগুলো। ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজগুলোর মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনীকে সাহায্যকারী অনেকগুলো বিদেশি জাহাজও থাকায় এই অপারেশন বাংলাদেশের যুদ্ধ এবং যোদ্ধাদেরকে সারা বিশ্বে পরিচিতি পাইয়ে দেয়।সারা বিশ্ব প্রথমবারের মতন বুঝতে পারে বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই লড়ছে।

মজার ব্যাপার হল এই অপারেশনে ‘আকাশবানী কলকাতা’ বেতারের পক্ষ থেকে পূর্বাঞ্চলীয় শ্রোতাদের জন্য প্রচারিত বিশেষ অনুষ্ঠানের দুটো গানকে অপারেশন জ্যাকপট পরিচালনার সংকেত হিশেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। গণ মাধ্যমকে ব্যবহার করে অপারেশনাল আদেশ প্রদানের জন্যে পৃথিবীর ইতিহাসে এটা এখনও একক দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। গান দুটো ছিল পঙ্কজ মল্লিকের গাওয়া "আমি তোমায় শুনিয়েছিলাম যত গান" এবং আরতী মুখার্জীর গাওয়া "আমার পুতুল যাবে শ্বশুরবাড়ি"।

অপারেশন জ্যাকপটে পংকজ মল্লিকের "আমি তোমায় শুনিয়েছিলাম যত গান" গানটি ১৩ আগস্ট সকালে একবার এবং সন্ধ্যায় আরেকবার প্রচার করা হয় ৷ এই গান শুনে অপারেশনে অংশগ্রহণকারীরা বুঝতে পারে যে তাদেরকে অপারেশনের প্রস্তুতি শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।

১৫ আগস্ট ১৯৭১ তারিখে প্রচার করা হয় আরতী মুখার্জীর "আমার পুতুল যাবে শ্বশুড়বাড়ি" গানটি ৷ এই গানটির মাধ্যমে তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয় ওইদিনই টার্গেট ধ্বংস করার। প্রতিটি নৌ-কমান্ডো দলের সাথে রেডিও সেট ছিল ৷

উল্লেখ্য, গানগুলি দু'বার প্রচার করার উদ্দেশ্য ছিল প্রথম সম্প্রচার কোন দল না শুনলে দ্বিতীয় সম্প্রচার যেন শুনতে পায় ৷ উল্লেখ্য, অপারেশনের দিনক্ষণ কোন দলই আগে থেকে জানতো না ৷

এভাবেই যুদ্ধের পুরো সময়ে সামান্য রেডিওই হয়ে উঠেছিলো গনহত্যা ও যুদ্ধ-ট্রমার শিকার এক প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং আত্ন-পরিবর্তনকামী জনপদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের হাতিয়ার।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

অসম্পাদিত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত