ঢাকা, ১৯ জানুয়ারি, ২০২০
সর্বশেষ:
জরুরি প্রয়োজনে কল করুন- ৯৯৯

মুণ্ডুহীন লাশের রহস্যভেদ: প্রেম-পরকীয়া-প্রতারণার ভয়াল কাহিনী

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশিত: ০০:২৬, ২০ ডিসেম্বর ২০১৯  

সন্ধ্যা ওরফে শাহনাজ ও গ্রেপ্তার মোজাম্মেল           ছবি: সংগৃহীত

সন্ধ্যা ওরফে শাহনাজ ও গ্রেপ্তার মোজাম্মেল ছবি: সংগৃহীত

সিলেট মহানগরীর ওসমানীনগরে গত ২ ডিসেম্বর এক তরুণীর মাথাকাটা দেহ উদ্ধারের সাতদিন পর ছিন্ন মস্তক উদ্ধার করে পুলিশ।  তদন্তে জানা যায়, হতভাগ্য ওই তরুণীর নাম সন্ধ্যা ওরফে শাহনাজ।  বিয়ের আগে তিনি খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ছিলেন। ভালোবেসে মোজাম্মেলকে বিয়ে করে স্বামীর ধর্ম ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু পারিবারিক অশান্তি ও পরকিয়াজনিত অপরাপর ঘটনার সূত্রে সেই স্বামীর হাতেই নির্মমভাবে খুন হতে হয়েছে তাকে। হন্তারক স্বামী মোজাম্মেলকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

গত বুধবার (১৮ ডিসেম্বর) ১৬৪ ধারায় নিজের স্ত্রী শাহনাজ হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয় স্বামী মোজাম্মেল মিয়া (২৪)। ওসমানীনগরের দক্ষিণ কলারাই গ্রামের মৃত জিলু মিয়ার ছেলে ও পেশায় রাজমিস্ত্রি মোজাম্মেলকে ১৬ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম দুই সপ্তাহে কোনো ক্লু না পেলেও শেষপর্যন্ত হত্যা রহস্য উদঘাটনে সক্ষম হয় পুলিশ।

আদালতে মোজ্জামেলের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির সূত্রে পুলিশ জানায়, সন্ধ্যা ওরফে শাহনাজের বাড়ি বরিশালে।  ‌‌'পরকীয়ার কারণে' স্বামী মোজাম্মেল মিয়া ওরফে মুজাম্মিলের হাতে খুন হন শাহনাজ।  পুলিশ জানায়, মোহন নামের স্থানীয় এক যুবকের সঙ্গে শাহনাজের ‘পরকীয়া’ ছিল বলে জানা গেছে।  একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে প্রথমে শ্বাসরোধ করে খুন করে মোজাম্মেল।  পরে স্ত্রীর লাশের গলা কেটে মাথা বিচ্ছিন্ন করে সে।  এছাড়া নাক, কান ও স্তনও কেটে ফেলে সে।  তবে শাহনাজের কথিত পরকীয়ার ব্যাপারে বিস্তারিত জানাতে চায়নি পুলিশ।

সাতদিন তদন্তের পর শাহনাজের কর্তিত মাথার সন্ধান পায় পুলিশ।  তবে এর আগে উদ্ধারকৃত দেহের সঙ্গে ওই মাথার মিল আছে কিনা তা পরীক্ষার জন্য ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে পাঠানো হয়।  

চাঞ্চল্যকর এ রহস্যঘেরা হত্যাকাণ্ডের সত্য উদঘাটনে ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটিও গঠন করা হয়।পুলিশের পক্ষ থেকে।   কমিটিতে ছিলেন সিলেটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ওসমানীনগর সার্কেল) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) লুৎফুর রহমান। 

পুলিশ সূত্র জানায়, মোজাম্মেলের প্রেমিকা শাহনাজের ব্যবহারে সন্তুষ্ট হয়ে একপর্যায়ে মোজাম্মেলের মা ও আত্মীয়স্বজন তাকে মোজাম্মেলের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি হন।  বিয়ের পর তাদের সংসার শান্তিতেই চলছিল।  কিন্তু কিছুদিন পর থেকে শাহনাজের আচরণে পরিবর্তন দেখতে পান মোজাম্মেল। বাড়িতে মোজােম্মেলের মা-ভাই ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে শাহনাজের বিরোধ দেখা দেয়।  পরিস্থিতিতে সামাল দিতে শাহনাজকে বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে রেখে নিজের কাজ করতে থাকেন মোজাম্মেল।  তবে দুজনের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো।  এ সময় শাহনাজের পরকীয়া সম্পর্কের বিষয়টিও জানতে পারে মোজাম্মেল।  এতে নিজেকে প্রতাড়িত ভাবতে থাকে সে।   

এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩০ নভেম্বর বেলা ১টার দিকে সিএনজি অটোরিকশাযোগে মোজাম্মেলের খালার বাড়ির উদ্দেশ্যে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার চণ্ডিপুল থেকে গোয়ালাবাজার যান মোজাম্মেল ও শাহনাজ।  সেখান থেকে ওসমানীনগরের উনিশ মাইল এলাকার আগে নাটকিলা নামক একটি স্থানে নেমে পড়েন স্বামী-স্ত্রী।  ধানী জমির মধ্য দিয়ে তারা উনিশ মাইলে মোজাম্মেলের বড় খালা ফুলমতির বাড়ির পথে রওয়ানা দেন।  এর মধ্যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত হয়ে গিয়েছিল। 
মোজাম্মেল ও শাহনাজ হাওরের (বিল) মধ্য দিয়ে পশ্চিম দিকে এগোতে থাকেন।  একপর্যায়ে হাওরের শুনশান আবহে দৈহিক মিলনের ইচ্ছা জাগে শাহনাজের।  এ বিষয়ে স্বামীকে প্রস্তাব করতেই মোজাম্মেল ধমক দেন।  এতে শাহনাজও ক্ষিপ্ত হয়ে মোজাম্মেলকে গালিগালাজ করেন।  এসময় উত্তেজিত শাহনাজ জানান, মোজাম্মেলকে ছেড়ে মোহন নামের এক যুবককে তিনি বিয়ে করবেন।  প্রচণ্ড রেগে যাওয়া শাহনাজ একপর্যায়ে তাকে ‘আম্মা’ ডাকতে বলেন মোজাম্মেলকে।  এতে মোজাম্মেলও প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়।  এসময়ে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে শাহনাজকে  হত্যা করে সে।  পরে লাশ লুকানোর ফন্দি করতে থাকে।   

একপর্যায়ে নিহত শাহনাজের বোরকা, জামাকাপড় সব খুলে ফেলে তার হাতব্যাগ, মোবাইল একত্র করে মোজাম্মেল।  এরপর নিজেও উলঙ্গ হয়ে হাওরের কাদাপানি গায়ে মেখে উনিশ মাইল বাজারে যায়।  সেখানে ওয়ার্কশপের দোকানের বাইরে পড়ে থাকা চিকন স্টিলের পাত ও সিমেন্টের দুটি প্লাস্টারের টুকরো তুলে নেয়।  স্টিলের পাত প্লাস্টারের টুকরোয় ঘষে ঘষে ধার দিয়ে ছুরির ফলার মতো করে ফেলে সে।  এরপর ফের হাওরে শাহনাজের লাশের কাছে ফিরে আসে সে।  এবার স্টিলের পাতে তৈরি চাকু দিয়ে তার গলা কেটে মাথা বিচ্ছিন্ন করে।ফেলে।   এরপর লাশের নাক, কান এবং স্তনও কেটে ছুঁড়ে ফেলে দেয় এদিক সেদিক।  বিচ্ছিন্ন মাথাটি ধর থেকে ২শ গজ দূরে নিয়ে পুঁতে রাখে মাটিতে।  এসময় স্টিলের পাত দিয়ে বানানো ওই ছুরি দিয়ে শাহনাজের লাশের উরু ও পেটে একাধিক কোপ দেয় সে।  

পরে সেখান থেকে সরে এসে পশ্চিম কালারাই গ্রামের দক্ষিণে নাটকিলা নদীতে স্টিলের পাত তথা ছুরি ছুড়ে ফেলে।দেয় এবং শাহনাজের কাপড়চোপড়, মোবাইল ফোন পার্শ্ববর্তী একটি ইটভাটার জ্বলন্ত চুলায় ফেলে দেয় মোজাম্মেল।  সবশেষে ভাগলপুরের নির্জন রাস্তায় ৪০ মিনিট অপেক্ষা করে ফজরের আজানের পর বাস যোগে সিলেটে নিজের খালার বাসায় চলে যায় মোজাম্মেল।

ওসমানীনগর থানার ওসি (তদন্ত) এসএম মাঈন উদ্দিন জানান, ঘাতক মোজাম্মেলকে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ‌'অজ্ঞাত পরিচয়' লাশটি তার বিবাহিত স্ত্রীর বলে জানায়।  পারিবারিক কলহের জের ধরে সে নিজেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে মস্তকসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ছিন্ন করে লাশটি হাওরে ফেলে রাখে বলেও স্বাীকার করে সে।  

মোজাম্মেল আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে স্ত্রী শাহনাজকে হত্যার এই বর্ণনা দেয়।
নিউজওয়ান২৪.কম/এসএল

আরও পড়ুন
অপরাধ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত