ঢাকা, ২৬ জানুয়ারি, ২০২০
সর্বশেষ:
জরুরি প্রয়োজনে কল করুন- ৯৯৯

ভারতে সিএবি`র তাপে জ্বলছে আসাম, পুলিশের গুলিতে নিহত ৩

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশিত: ০১:১৭, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯  

কারফিউ ভেঙে প্রতিবাদ বিক্ষোভে রাস্তায় নেমে আসা মানুষের ওপর পুলিশের গুলিতে আসামে নিহত হয়েছেন ৩ জন।  গত বুধবার ভারতীয় পার্লামেন্টে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (সিএবি) পাস হওয়ার পর থেকেই উত্তাল হয়ে উঠেছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসাম।  

রাজ্যের রাজধানী গুয়াহাটিতে গতকাল (বৃহস্পতিবার) কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নেমে আসে শিক্ষার্থীসহ হাজারো মানুষ। এসময় বিক্ষুব্ধ জনতাকে সামাল দিতে পুলিশ গুলি ছুড়লে তিনজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়।  রাজ্যে এরই মধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে রেল যোগাযোগ।, বাতিল করা হয়েছে বহু ফ্লাইট।  গত বুধবারই সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল আসাম রাজ্যে।  এছাড়া গুজব ছড়ানো বন্ধের কথা বলে ইন্টারনেট পরিসেবাও বন্ধ রাখা হয়েছে।  অন্যদিকে, সাধারণ মানুষকে শান্ত রাখার আশায় গতকাল টুইট বার্তা দেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।  তবে তার টু্ইটাবেদন কয়জনের কাছে পৌঁছেছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। 

অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়নের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরুদ্ধে লড়াই চলবে।  বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় গুয়াহাটির লতাশীল ময়দানে জমায়েতের ঘোষণা দেয়া হয়।।  এ জন্য সবাইকে ঘর ছেড়ে রাস্তায় নামার আহ্বান জানায় স্টুডেন্টস ইউনিয়ন।  অপরদিকে, বিক্ষোভ দমনে রাজ্য পুলিশ বিভিন্ন স্থানে গুলি চালাতে বাধ্য হয়েছে বলে জানিয়েছে এনডিটিভি।  উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গুয়াহাটি পুলিশের প্রধানকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। আসামের ১০ জেলায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সংযোগ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে আগামী ৪৮ ঘণ্টার জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার উত্তাল আসামে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে অন্তত চারটি স্থানে তুমুল সংঘর্ষ হয়েছে পুলিশের।  এসব এলাকায় সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন হয়েছে।  এছাড়া রাজ্যের উত্তরপূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়েছে দফায় দফায়।

মূলত বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে শরনার্থী হিসেবে যাওয়া হিন্দু, খ্রিস্টান, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ ও পার্সি- এই ছয় ধর্মে বিশ্বাসী ব্যক্তিরেকে নাগরিকত্ব দেওয়ার লক্ষেই এই বহুল সমালোচিত নাগরিকত্ব সংশোধন বিল (সিএবি) তোলা হয়।  এর মাধ্যমে নাগরিকত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে মুসলমানদের।  ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনে ভারতের নাগরিকত্বের আবেদন করার আগে ১১ বছর দেশটিতে থাকার শর্ত উল্লেখ করা হয়েছিল।  এই সুযোগ মুসলমানদের জন্যও অবারিত ছিল।  নতুন প্রস্তাবে সে সময় কমিয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছে।  সে হিসেবে প্রতিবেশি দেশ থেকে ২০১৪ সালের আগে যাওয়া এসব মতাদর্শে বিশ্বাসী লোকজনকে নাগরিকত্ব দিতে চায় ভারত।  সে লক্ষ্যেই বিলটি গত সোমবার লোকসভায় তোলা হয়। প্রসঙ্গত গত সপ্তাহে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় পাস হয়।  যদিও আলোচনা রয়েছে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নাগরিকত্বই নিশ্চিত করতে চাইছে ক্ষমতাসীন বিজেপি।  কারণ এরা বিজেপির ভোট ব্যাংক হিসেবে কাজ করে। 

উল্লেখ্য, সিএবি তথা নাগরিকত্ব সংশোধন বিলটি পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় ওঠার পর থেকেই আসাম রাজ্যে বিক্ষোভ শুরু হয়।  তবে গতকাল তা চরম আকার ধারণ করে।  কারফিউ ভেঙে মানুষ রাস্তায় নেমে এলে পুলিশ গুলি ছোঁড়ে।   এতে আহত পাঁচজনকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে তিন জনের মৃত্যু হয়।  আর গত তিন দিনে বিতর্কিত বিলকে কেন্দ্র করে ৪০জন আহত হয়েছে।  স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানায়, গুয়াহাটির লালুঙ গাঁও-তে এ দিন বিক্ষোভ সামাল দিতে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে পুলিশ।  এ সময় তারা গুলি ছোড়ে।  মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামেশ্বর তেলিসহ বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার বাসভবনে হামলা করেছে আন্দোলনকারীরা।  ছাবুয়া এলাকায় এক বিজেপি বিধায়কের বাড়ি়তে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে।  সেখানে একটি দপ্তরেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।  নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের প্রতিবাদে চলমান আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (আসু) এবং কৃষক মুক্তি সংগ্রাম সমিতি (কেএমএসএস)।  গত সোমবার এ দুটি সংঠনই ধর্মঘটের ডাক দেয়। 

এমন বেসামাল পরিস্থিতিতে গুয়াহাটির পুলিশ কমিশনার দীপক কুমারকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।  বিক্ষোভ হিংসাত্মক আকার ধারণ করায় গতকাল থেকেই অবরুদ্ধ রয়েছে আসাম, রেল যোগযোগ বন্ধ।  গতকাল বহু ফ্লাইটও বাতিল করা হয়।  এছাড়া গতকাল গুয়াহাটিতে রঞ্জি ট্রফির একটি ফুটবল ম্যাচও বাতিল করা হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টুইটারে আসামবাসীর উদ্দেশে বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।  অসমিয়া ভাষায় তিনি লেখেন, ‘সিএবি নিয়ে আশঙ্কার কোনও কারণ নেই।  কেউ আপনাদের অধিকার কাড়তে পারবে না।  আপনাদের ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতির ওপর কোনো আঘাত আসবে না।’ উল্লেখ্য, গত সোমবার থেকেই আসামে ইন্টারনেট বন্ধ।  ফলে প্রধানমন্ত্রীর এই টুইটের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।  আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালও শান্তি বজায় রাখার আর্জি জানান সাধারণ মানুষের কাছে।  বিজেপির জেলা স্তরের নেতাদের নিয়ে একটি বৈঠকে তিনি বলেন, ‘আমাদের হাতে যা তথ্য রয়েছে, তাতে এ রাজ্যে পাঁচ লাখের বেশি অনুপ্রবেশকারীকে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে না।  তাই আমাদের সংস্কৃতির এবং ঐতিহ্যের কোনও সঙ্কট দেখা দেবে না।’
তবে প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীর এসব বক্তব্যের প্রভাব আসামের সাধারণ মানুষের ওপর পড়েনি বললেই চলে।  আসু’র উপদেষ্টা সমুজ্জল ভট্টাচার্য গতকাল 
(বৃহস্পতিবার) এক সভায় বলেন, ‘এই বিল পাস করে প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী আসামের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাষঘাতকতা করেছেন।  আসাম ভাগাড় নয় যে সব আবর্জনা এখানেই ফেলতে হবে।’ তারা ১২ ডিসেম্বরকে ‘কালো দিবস’ ঘোষণা করে বিলটি প্রত্যাহারের দাবি করে।   

তবে উভয় কক্ষে পাস হওয়ার ফলে বহুল চর্চিত নাগরিকত্ব সংশোধন বিলটিতে এখন ভারতের প্রেসিডেন্ট স্বাক্ষর করলেই তা আইনে পরিণত হবে।  অর্তাৎ শুধু প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিকতাটা বাকি আছে।  

তবে বিতর্কিত এই আইন কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে এখুনি নিশ্চিত করে বলা যায় না।  এরই মধ্যে এই বিলের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছে ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ।  তাদের সঙ্গে এই বিলের বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক দলগুলোও রয়েছে।  তাদের প্রতিনিধি পিকে কুহালিকুত্তি বলেন, ‘সংবিধানে  বর্ণ, ধর্ম বা অন্য কিছুর ওপর ভিত্তি করে বৈষম্য করার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।  আইনে সিএবি টিকবে না।’ লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও এই বিল ‘গোঁড়ামিপূর্ণ’ বলে অভিহিত করে বাতিল করার আহ্বান জানিয়েছে।  
নিউজওয়ান২৪.কম/এসএল

বিশ্ব সংবাদ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত