ঢাকা, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯
সর্বশেষ:
জরুরি প্রয়োজনে কল করুন- ৯৯৯ আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন ডিসেম্বরে হেল্পলাইন ১৬২৬৩ এ কল করলেই ডাক্তারের পরামর্শ

পুলিশ ঘটনার শেষে নয়, আগেও আসে তাহলে!

বিশেষ প্রতিবেদন

প্রকাশিত: ১১:১১, ২৭ জুলাই ২০১৫   আপডেট: ১২:০৮, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫

এ যেন ফ্যান্টাসি সিনেমায় দেখানো কোনও অলীক-অবাস্তব ঘটনা। না, এটা মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুর কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণের ঘটনাও নয়। এটা গ্রামীণ দলাদলি-সংঘর্ষ অবসানের লক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানের দৃশ্য।

আমাদের গ্রামীণ সমাজে নিজের আত্মীয়-প্রতিবেশী-বন্ধুরা হঠাৎ লেগে যাওয়া সংঘর্ষে ব্যবহারের জন্য ভয়াবহ আদিম অস্ত্র তৈরি করে রাখে। `দরকার পড়লেই` যাতে মাচান থেকে বা চৌকির তলা থেকে বের করে নিয়ে ছুটতে পারে একদার বন্ধু বা রক্ত সম্পর্কের আত্মীয় কিংবা পরমাত্মীয়ের চেয়েও বেশি ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীর ঘাড় থেকে মাথাটা ফেলে দিতে, কিংবা সীনা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিতে।

অনুষ্ঠানে আরও একটা সত্য প্রকাশ পেল যেন নতুন করে। তিক্ত সত্যটা হলো `কাইজ্যার আছে মানুষ মিলের বেলায় নাইরে মানুষ`। এটা সবচেয়ে বেশি বুঝলেন সম্ভবত আজিজার। দেখা গেল, শেষ পর্যন্ত গ্রামীণ সংঘর্ষে বাড়িঘর হারিয়ে মসজিদে আশ্রয় নেওয়া আজিজার রহমানের পাশে দাঁড়ালেন পুলিশের এসপি একেএম এহসান উল্লাহ।
যে মাতব্বরদের কথায় শত শত মানুষ আদিম অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে একে অন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রকাশ্য সভায় সেই প্রভাবশালীদের কেউই কিন্তু আজিজারকে একটি ঘর তৈরির নুন্যতম সহায়তা করতেও রাজি হলেন না। বিষয়টা সেদিন অনেককেই ভাবিয়েছে গভীরভাবে। বিশেষ করে গ্রামের সহজসরল মানুষগুলোকে- যারা মুরব্বীদের কথায়, মাতব্বরদের ইঙ্গিতে নিজের নিরীহ-নিপাট অহিংস রূপ ছেড়ে হঠাৎই হয়ে পড়েন ভয়াবহ `বীরযোদ্ধা`। ফেলে দেন লাশের পর লাশ।

মাগুড়ার সদর উপজেলার ডহড়সিংড়া গ্রামে গত কয়েকদিন ধরে চলা বিপজ্জনক ঘটনার ধারাবাহিকতা ঠেকাতে শেষ পর্যন্ত কমিউনিটি পুলিশের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় এ সভার। সেখানেই সব হারানো আজিজার রহমানকে তার ঘর মেরামতের জন্য ১০ হাজার টাকা দেওয়ার ঘোষণা দেন পুলিশের এসপি একেএম এহসান উল্লাহ। গত শনিবার (২৬ জুলাই) বিকেলে স্থানীয় ডহড়সিংড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে পুলিশ সুপার এ ঘোষণা দেন।

এ প্রসঙ্গে কথা হলে মাগুড়ার মেধাবী সাংবাদিক রূপক আইচ নিউজওয়ান২৪.কমকে জানালেন, ডহরসিংড়া গ্রামের এনামুল হক রাজার ও শফিকুল ইসলাম শফিকের মধ্যকার পুরনো শত্রুতার জের ধরেই এ সংঘর্ষ বাঁধে। তবে আজিজারের ভাঙ্গা ঘর মেরামতে রাজা, শফিক বা অন্য কোনো প্রভাবশালী মোড়ল-মাতব্বর এগিয়ে আসেননি। বরঞ্চ সভায় উপস্থিত তথাকথিত মাতব্বররা উল্টো আজিজারের মতো সাধারণ গ্রামবাসীদের দোষ দেন। তারা বলেন, প্রভাবশালীরা ডাকলেই এরা দৌড়ে যায় কেন মারামারিতে? প্রশ্নটা জটিলই বটে!

পুলিশ সপার এহসানের মতে, নিজেরা ঝগড়া, মারামারি আর ফ্যাসাদ লাগিয়ে নানান কায়দায় ঘটনার ফল নিজের দিকে আনতে ব্যর্থ হয়ে শেষে পুলিশকে ডাকে এসব প্রভাবশালী। ততদিনে মামলার আলামত, সাক্ষ্য-সাবুদ সব বদলে যায়, নষ্ট করে ফেলা হয়। এ নিয়ে দেখা দেয় নয়া জটিলতা। এসব সমস্যার সমাধান আসলে শুরুতেই করে ফেলা যায়- নিরপেক্ষ সামাজিক বিচারে। কিংবা ঘটনা যাতে না’ই ঘটতে পারে- এ ধরনের সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে।  

প্রসঙ্গত, এর আগেরদিন (শুক্রবার) সকালে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ওই গ্রামে দুগ্রুপের সংঘর্ষে আজিজার রহমানের বাড়ির সবকটি ঘর কুপিয়ে-ভেঙ্গে প্রায় মাটিতে মিশিয়ে দেয় প্রতিপক্ষ। এসময় উভয় পক্ষের ২৭ জন আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়।

সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ৩০টি বাড়িঘরে হামলা করে ভাংচুর চালানো হয়। হামলার শিকার হয়ে আজিজারের বাড়ির ৪টি ঘরই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ফলে আজিজার রহমান পরিবার পরিজন নিয়ে পার্শ্ববর্তী মসজিদে বসবাস শুরু করতে বাধ্য হন।

এ পরিস্থিতিতে এগিয়ে আসে দৈনন্দিন নানান ঘটনার সূত্রে হরদম সমালোচনার শরে বিদ্ধ পুলিশ। এই পুলিশ যে আসলেই সমস্যার সমাধানও করে, করতে পারে- তারই উদাহরণ হয়ে রইলো শনিবার বিকেলে স্থানীয় ডহরসিংড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে কমিউনিটি পুলিশ আয়োজিত সভাটি। কাইজ্যায় (মারামারিতে) ব্যবহৃত ঢাল-সড়কি সমর্পণ অনুষ্ঠান এক মহতি আবহের রূপ নেয়। এসময় সংঘর্ষে ব্যবহৃত বেশকিছু ঢাল, সড়কি ও অস্ত্র এসপির কাছে জমা দেয় এলাকাবাসী।
ইতিবাচক আর শান্তির বার্তাবাহী ওই অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম, সহকারি পুলিশ সুপার (সার্কেল) সুদর্শন কুমার রায়, সদর উপজেলা পরিষদের নব নির্বাচিত চেয়ারম্যান রোস্তম আলী, সদর থানা ওসি আসাদুজ্জামান মুন্সি, বেরইল পলিতা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মহব্বত আলী, সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান এনামুল হক রাজা, ডহড়সিংড়া গ্রামের মাতব্বর শফিকুল ইসলাম প্রমুখ। এনামুল হক রাজা বনাম শিফকুল ইসলাম শফিক।
সভা থেকে এলাকায় শান্তিশৃংখলা রক্ষায় সবাইকে একজোট হয়ে কাজ করার আহবান জানানো হয়। অনুষ্ঠানে এলাকার মাওলানা আবু সাঈদের পরিচালনায় মোনাজাতের মধ্য দিয়ে এলাকাবাসী তওবা করে। তারা আর কখনো এ ধরনের সংঘর্ষে জড়িত না হওয়ার জন্য কথাও দেন।

উল্লেখ্য, দেশের অন্যান্য বেশ কটি জেলার মতো মাগুরার বিভিন্ন গ্রামেও প্রায়ই সামান্য ঘটনা নিয়ে গ্রামের বিভিন্ন গ্রুপ বা `সমাজের` সদস্যরা একে অন্যের বিরুদ্ধে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। যা নিরসনের এসে পুলিশও অসহায় হয়ে পড়ে। অনেক সময় আশপাশের গ্রাম-ইউনিয়ন-উপজেলা এমনকি পাশের জেলা থেকেও আত্মীয়-বন্ধু বা ভাড়াটে লাঠিয়ালরা এসে তাতে যোগ দেয়।

মাগুরায় এবং অন্যান্য জেলায় এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সভাসমাবেশ করে গণসচেতনতা তৈরির চেষ্টা করে যাচ্ছে পুলিশ। গ্রাম্য প্রভাবশালী পক্ষগুলো এর সহায়তায় এগিয়ে এলে এ ধরণের রক্তারক্তি আর প্রাণহানিকর সংঘর্ষ অনেকাংশেই কমে আসবে বলে মত প্রকাশ করেন উপস্থিত সুধীরা।

প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার পাশের শত্রুজিৎপুর ইউনিয়নের রূপদহ গ্রামে এ ধরনের সংঘর্ষে একজন নিহত হন।

নিউজওয়ান২৪.কম/এমএ  

আরও পড়ুন
স্বদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত