ঢাকা, ২৩ এপ্রিল, ২০২৪
সর্বশেষ:

ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে ইকোনমীর মেরুদন্ড হয়েও অনেক অবহেলিত (ভিডিও)

অসম্পাদিত ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫:২৫, ১৮ মার্চ ২০২৪  

ছবি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীত

ছবি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীত


প্রায় কয়েক যুগ যাবৎ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে আমার যাতায়ত। বাস, ট্রাক, কার সবকিছুতে চড়ে গিয়েছি। আবার এই ভারী ও হালকা যানবাহন চালিয়েও গিয়েছি। পেশাগত কারণে এই মহাসড়কের সাথে আমার একটা নিবিড় সম্পর্ক, যাকে আমি মনে করি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনফ্রাস্ট্রাকচার তারপরেও বেশ অবহেলিত!

প্রতিদিন প্রায় লক্ষাধিক যানবাহন চলাচল করে এই মহাসড়কে আর এগুলোর একটা বড় অংশ আমাদের অর্থনীতিতে ব্যপক অবদান রাখে। যে সময় এই রাস্তাটা ৬ লেন হবার কথা ছিলো, সে সময় মাত্র ২ লেইন দিয়েই আমাদের চলাচল করতে হয়েছে। বহু জান-মাল  চলে গেছে দূর্ঘটনায়। বহু কার্গো ডেলিভারি দেরিতে হয়েছে। পোর্টের কার্যক্রমও শ্লথ হয়ে গেছে। জাহাজ-সহ বিভিন্ন পেনাল্টিতে সকল সংশ্লিষ্টদের অর্থ অপচয় হয়েছে। গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির শিপমেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে নেতিবাচক যেটা ঘটেছে, তা হলো বিগত বছরগুলোতে শত শত কোটি টন ফুয়েল এক্সট্রা বার্ণ হয়েছে। পরিবেশ দুষন হয়েছে কয়েকশ গুণ বেশি।

ছবি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীতছবি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীত

বর্তমানে মাত্র ৪ লেইনের রাস্তা, যেখানে বর্তমান ট্রাফিক ডেন্সিটি, বানিজ্যিক চাহিদা ইত্যাদীর বিবেচনায় নূন্যতম ৮-১০ লেইন ডিমান্ড করে। বাংলাদেশের কোন রাস্তাই এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না, অথচ এর চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ন রাস্তাও অনেক সমান মনোযোগ পেয়েছে। বর্তমানে শুনলাম এই রাস্তা ৬ লেনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু ৬ লেইন যে কতটুকু অপ্রতুল তার কিছু বিষয় আমার কয়েক যুগের বাস্তব অভিজ্ঞতায় শেয়ার করবো।

ছবি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীতছবি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীত

বাস্তব সমস্যাগুলো

একটি বিষয়, আমরা এই ব্যাকবোন মহাসড়কটিকে কখনই ভবিষ্যত বান্ধব করে তৈরি করি নাই। যা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তার বাস্তবায়ন হতে হতেই সেটা তাৎক্ষণিক চাহিদার প্রেক্ষিতে সেকেলে হয়ে যায়। যখন ৪ লেনের দরকার ছিলো ,  তখন আমরা ২ লেনে চলেছি। এখন নূন্যতম ৮ লেনের দরকার, আমরা ৬ লেনের প্ল্যান করছি। আর এই ৬ লেন নির্মাণ যেদিন শেষ হবে, তখন হয়তো প্রয়োজনীয়তা হবে ১০-১২ লেনের। এভাবেই আমরা আজীবন পিছিয়েই থাকছি।

আগে আমাদের ইকোনমি নাজুক ছিলো, ফান্ডিং অপ্রতুল ছিলো। এখন আমরা পদ্মা সেতু, কর্নফুলী টানেল, বিভিন্ন এক্সপ্রেসওয়ের মতো বনেদি ও ব্যয়বহুল প্রকল্পকে বাস্তবায়ন করেছি যার সুবিধা অপরিসীম। আশা করি কর্তৃপক্ষ দেশের এই মেরুদন্ডসম ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেমের দিকে নজর দেবেন। প্রয়োজনে অন্য প্রকল্প অপেক্ষায় রেখে হলেও।

ছবি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীতছবি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীত

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমি প্রায় ১২ বার সেল্ফ ড্রাইভেন গাড়ী নিয়ে এ রাস্তায় যাতায়ত করি। প্রতিটা জার্নি ছিলো রিস্কি। এ সময় বহু অনিয়ম, এক্সিডেন্ট ও সেচ্ছাচারিত দেখেছি। এছাড়াও পূর্বে বহু ভারী যানবাহন, কমার্শিয়াল এর কনভয় নিয়েও যাত্রা করেছি। বর্তমান প্রেক্ষিতে এই মহাসড়ক নিচের গাড়ীগুলোর জন্য চলাচল বান্ধব নয়। যথা-

(১) কার্গো ট্রাক, লো বেড, কন্টেইনার ক্যারিয়ার। 
(২) মটর সাইকেল, ট্রেইলার।

আমরা সহজেই ট্রাক, লরী, লো বেড ড্রাইভারদের অনেক দোষারোপ করি, হেয় প্রতিপন্ন করি। কিন্তু একজন প্রফেশনাল ট্রাক, লো-বেড, ফর্ক লিফটার চালক ও ট্রেইনার হিসেবে আমি বুঝি এই রাস্তা কতটা অনপুযুক্ত। বিশেষ করে কার্গো কন্টেইনার, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভেহিক্যাল ও লো-বেড ড্রাইভারদের জন্য। 

প্রথমত; ইনবিল্ট ব্লাইন্ড স্পট, ভেহিক্যাল সাইজ।
দ্বিতীয়ত; লোড বনাম ব্রেকিং ডিস্ট্যান্স। 
তৃতীয়ত; আনরুলী ফাস্ট ম্যুভিং ট্রাফিক, বিশেষ করে বাইক, হালকা যানবাহন যা দৃষ্টিগোচর কম হয়, আবার দৃষ্টিগোচরের সাথে সাথেই পজিশন/এক্সেলেরেশন চেঞ্জ হয়। 
চতুর্থত; বাজার ঘাটের পথচারী, রিকশা, ভ্যান ইত্যাদির অনুপ্রবেশ।

ছবি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীতছবি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীত

এই রাস্তায় মটরসাইকেল চালানোর মানে হলো নিজের জীবনের ঝুকি নিয়ে চলা। অবশ্য এর পেছনে বহু মটরসাইকেল চালকরাও বহুলাংশে দায়ী। কারণ তারা অজ্ঞাতে, সজ্ঞানে, ভুলে ক্রমাগত লেন ভায়োলেট করে। 

আর হালকা যানের মাঝে অধিকাংশ প্যাসেঞ্জার কার চলাচলে মোটামুটি ওকে যদিও কিছু কার, লাইট ট্রাক প্রচুর লেন ও স্পীড ভায়োলেট করে। 

ভাড়ী যানবাহনের মাঝে বাস সবচেয়ে কম্ফোর্টেবলী চলাচল করে। কারণ এদের বিশাল আকৃতির প্রেজেন্স এদেরকে রাস্তায় প্রায়োরিটি এনে দেয়, হালকা ওজন বিধায় (লরী, ট্রাক, কার্গো থেকে) এরা কুইকলি এক্সেলারেশন ও ডিসেলারেশন,  স্টিয়ার করতে পারে।

ছবি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীতছবি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীত

প্রধান সমস্যা

কিন্তু বর্তমানে সবার জন্য সবচেয়ে বড় বাধা ভাড়ী লোড বহনকারি বিভিন্ন লরি, লো-বেড, কমার্শিয়াল ভেহিক্যাল। (ইঞ্জিনের পাওয়ারের তুলনায় অনেক লরি ওভার লোডেড থাকে, সে আলোচনা নাই করলাম)। এই শ্রেণির ভারী যানবাহন পুরো ট্রাফিক ফ্লোকে শ্লথ করে দেয়। কিছু ছবি ও ভিডিও দিলাম যা থেকে ভালো ধারণা পেতে পারেন।

দুটো লোডেড গাড়ী যা স্লো চলে, তাদের একজন আরেকজনকে ওভারটেক করতে গেলে সময় লাগে ১ মিনিট থেকে ৩ মিনিট পর্যন্ত। বা গড়ে ৩০০ মিটার থেকে ১ কিমি স্থান লাগে একটা সিংগেল ওভার টেকে। আর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয় প্রায় শতবার। (আমার লাস্ট একটা ট্রিপের কিছু ছবি ও ভিডিও আপনাদের জ্ঞতার্থে দিলাম) ২৫০ কিমি সচারচর ৩ ঘন্টার জার্নি; যা অপ্রতুল লেনের জন্য প্রায়শই ৬ ঘন্টা লাগে।

দোষটা ভারী যান চালকদের না। দোষটা অপরিকল্পিত ও অপর্যাপ্ত লেইন সম্বলিত মহাসড়কের। এক দিকে যাবার জন্য মাত্র দুটো লেন। এটা যদি অদূর-ভবিষ্যতে ৬টি লেনেও হয়, তবুও পরিস্থিতির খুব বেশি উন্নতি হবে না। কারল ৬ লেনের কাজ শেষ হতে হতে আমাদের লাগবে ১০ লেন। আর ৬ লেন হলে ভারী যানবাহনগুলো হালকা যানবাহনের লেনে অনুপ্রবেশ করবে বা বীপরিতও হতে পারে।

ছবি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীতছবি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীত

প্রস্তাবনা

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ককেও শুনেছি ৬ লেন করা হবে। এখন আমার কাছে সর্বশেষ স্ট্যাটিসটিকস নাই যে সিলেট দিয়ে আমাদের বানিজ্যের কত অংশ হয় আর চট্যগ্রাম দিয়ে কতটুকু হয়। অনুমান করতে পারি, আনুমানিক ৭৫% হয় চট্টগ্রাম দিয়ে। তাহলে কি করে এই দুই সড়ক একই রকম প্রায়োরিটি পায়? দুটোই ৬ লেনের প্ল্যান। সে ক্ষেত্রে সিলেট ৬ লেন হলে ত চট্টগ্রাম ১২ লেনের হবার কথা। যাহোক, সেই স্টাডি, রিসার্চ যথাযথ কর্তৃপক্ষই করুক।

একজন ভুক্তভোগী,  চলাচলে ও চালনায় অভিজ্ঞ, পেশাদার ম্যাস ট্রান্সপোর্ট ম্যানেজমেন্ট অভিজ্ঞ এই বিষয়ে বিভিন্ন সময় কাজ করার প্রেক্ষিতে আমি আমার মতামত শেয়ার করছি। যেটা একান্তই আমার ব্যাক্তিগত মতামত। ডেডিকেটেড কোনো এজেন্সী কর্তৃক রিসার্চ ও স্টাডি থেকে আমরা আরো ভালো কিছু সমাধানও পেতে পারি।

এ মুহুর্তেই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে এক্সপ্রেস ওয়ের আদলে নির্মান করা উচিত, এবং তা হওয়া উচিত নূন্যতম ৫+৫=১০ লেইনের। যাতে অদূর ভবিষ্যতেই আবার সড়ক ভাংগা ভাংগির প্রয়োজন না হয়। দেশের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ, মেরুদন্ডসম ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেমকে অন্তত ৫০ বছর উপোযোগী করে নির্মাণ করা উচিত। আমাদের না খেয়ে এটম বোমা বানানোর কোনো দরকার নাই। কিন্তু কম খেয়ে এই ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেমটা বানানো অতি জরুরি। আমি নিশ্চিত যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে বা আমাদের সর্বোচ্চ লীডারশিপের কাছে এই বার্তা সঠিক ভাবে পৌছালে তা অবশ্যই বাস্তবায়ন হবে।

ছবি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীতছবি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীত

এবার আসুন জানি এক দিকে যাত্রার ৫ লেইনের বিভাজন

> ২ কমন ট্রাফিক লেইন (দ্রুতগামী বাস, কার, হালকা যানবাহন

> ২ ডেডিকেটেড এন্ড হেভী প্রায়োরটি লেইন- ধীর গতির ভারী কার্গো যানবাহন, লো বেড।

> ১টি লেইন- সার্ভিস ও মটর সাইকেল।

উল্লেখ্য, যোগ্য স্থানে এই লেনগুলোকে শেফার্ড ব্যারিয়ার দেওয়া বাঞ্চনীয়। যাতে চালকদের ধাতস্থ হতে সহায়ক হবে। 

> এছাড়াও বাজার এলাকাকে কম্পলিট ব্যারিয়ার দিতে হবে। 

> বিভিন্ন নির্বাচিত স্থানে লেনের বাইরে সাইড পার্কিং, বাস স্টপ দিতে হবে। 

> পরিকল্পিত ভাবে ক্রস রোড, ফ্লাই ওভার, আন্ডার পাস, ওভার পাস, ইউটার্ন ইত্যাদী রাখতে হবে।

> ডাউন রোলে বা প্রয়োজনীয় জায়গায় কুকিং-অফ ভেহিক্যাল পিট দিতে হবে।

ছবি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীতছবি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীত 

নির্মাণের সাফল্যে কিছু ফলাফল

> আশাকরি তখনই এই ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম ভবিষ্যৎ বান্ধব হয়ে আমাদের চলাচল ও ন্যাশনাল ইকোনমিকে কয়েক যুগ সাপোর্ট করতে পারবে। 

> দেশের প্রচুর জ্বালানী অপচয় রোধ হবে এবং পরিবেশ দূষণকে প্রতিহত করা যাবে।

> বানিজ্য, গার্মেন্টস ও অন্যান্য শিল্পে গতি আসবে।

> আরো প্রচুর মানুষ ট্যুরিজমে দক্ষিনে যাবে এতে ইকোনমিক অ্যাক্টিভিটিজ বহুগুনে বাড়বে, লাখ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে।

> এটা ভবিষ্যতে এশিয়ান হাইওয়ের সহায়ক সিস্টেম হতে পারে; যা দিয়ে আমরা মায়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়শিয়ার সাথে বানিজ্য বৃদ্ধি করতে পারবো।

> আমি আপনি ঘন ঘন পরিবার নিয়ে কক্সবাজার, বান্দরবান ট্রিপ দিতে পারবো, এতে অনেকেই অর্থকে বিদেশে খরচ না করে দেশেই খরচ করবেন।

> একটা ভালো ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেমের দুপাশে বড় বড় শহর গড়ে উঠবে, এতে ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণ সহজ হবে। এর সাথে আরো অনেক সাবসিডিয়ারি অ্যাডভান্টেজ আমরা পাবো।

>>> ভিডিও <<< >>> ভিডিও <<<

-ছবি ও ভিডিও H M Sohel এর ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীত

নিউজওয়ান২৪.কম/রাজ

আরও পড়ুন
অসম্পাদিত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত