ঢাকা, ২৫ জুন, ২০২৬
সর্বশেষ:

যেভাবে পুড়িয়ে হত্যা: যেন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে জল্লাদরা

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ১০:৫৫, ১৬ এপ্রিল ২০১৯  

মৃত্যুশয্যায় নুসরাত (বামে) ও সঙ্গী পরিবেষ্টিত ঘাতক অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা (ডানে)     -ফাইল ছবি

মৃত্যুশয্যায় নুসরাত (বামে) ও সঙ্গী পরিবেষ্টিত ঘাতক অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা (ডানে) -ফাইল ছবি

বান্ধবী নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে, ৬ এপ্রিল এমন কথা শুনেই পরীক্ষা দিতে আসা নুসরাত জাহান রাফি দৌঁড়ে মাদ্রাসার ছাদে যায়। ছাদে ওঠার পর বান্ধবী নিশাতকে ছাদে খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল নুসরাত। অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার জেঠাসের মেয়ে উম্মে সুলতানা পপি এসময় নুসরাতকে বলে অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে করা মামলা তুলে নিতে। 

এরপর শাহাদাতের চাচাতো বোনের পালিত মেয়েও (নাম জানা যায়নি) নুসরাতকে একই কথা বলেন। নুসরাত তখন জবাবে বলে, মামলা উঠাব না। আমার গায়ে কেন হাত দিল। ওস্তাদ তো ওস্তাদ। আমি এর শেষ দেখেই ছাড়ব।

তদন্তকারীদের জিজ্ঞাসাবাদে ঘাতক দলের অন্যতম এবং এক সময়ে নুসরাতকে প্রেম নিবেদন করে প্রত্যাখ্যাত শাহাদাত বলেছেন, নুসরাতের এই জবাব শুনে পেছন থেকে এক হাত দিয়ে তার মুখ চেপে ধরেন ও অন্য হাত দিয়ে হাত ধরেন তিনি। 

অপরদিকে, উম্মে সুলাতানা পপি তখন নুসরাতের পা চেপে ধরে। একইসময়ে শাহাদাতের চাচাতো বোনের পালিত মেয়ে নুসরাতের শরীর চেপে ধরে। তিনজন মিলে ছাদের মেঝেতে ফেলে দেয় ‘শিকারকে’। এই সময়টাতে উম্মে সুলতানাকে তারা কৌশলে শম্পা বলে ডাক দেয়।

শাহাদাত বলেছে, নুসরাতকে মেঝেতে শুইয়ে ফেলার পর জোবায়ের নুসরাতের ওড়না নিয়ে দুই টুকরো করে তাঁর হাত ও পা বেঁধে ফেলে। জাবেদ তখন নুসরাতের সারা শরীরে কেরোসিন ঢালে। এরপর শাহাদাতের চোখের ইশারায় জোবায়ের তার দেশলাই কাঠি জ্বালিয়ে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর পাঁচজনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যায়। নামতে নামতেই ঘাতক দলের তিন ছাত্র তাদের বোরকা খুলে লুকিয়ে ফেলে। ছাত্রী দুজন মাদ্রাসায়ই নিজ নিজ পরীক্ষার কক্ষে চলে যায়। বাকি তিনজন নিজেদের মতো করে বের হয়ে যায় মাদ্রাসা থেকে।

তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিঁড়ি দিয়ে ওই পাঁচজন যখন নামছিল তখন নুসরাতের ‘আগুন, আগুন, বাঁচাও, বাঁচাও’ বলে চিৎকার তারাও শুনতে পায়। পা থেকে আগুন ধরানোয় আগুনে পুড়ে প্রথমে নুসরাতের পায়ের বাঁধন খুলে যায়। এরপর আগুন যখন ওপরে উঠে তখন হাতের বাঁধনও খুলে। তখনই নুসরাত উঠে দৌড়ে নিচে নেমে আসেন। তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নুসরাতের মুখ শাহাদাত চেপে ধরায় সেখানে আর কেরোসিন ঢালা হয়নি। তাই পুরো শরীর পুড়লেও মুখে আগুন লাগেনি।

শ্লীলতাহানির মামলায় মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাকে (৫৫) ঘটনার আগেই গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সিরাজ নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনারও এজাহারভুক্ত আসামি। অধ্যক্ষ বাদে মামলার এজাহারভুক্ত গ্রেপ্তার বাকিরা হচ্ছে, ‘সিরাজ উদদৌলা সাহেবের মুক্তি পরিষদ’ নামে গঠিত কমিটির আহ্বায়ক ও মাদ্রাসাছাত্র নুর উদ্দিন, যুগ্ম আহ্বায়ক শাহাদাত হোসেন ওরফে শামীম, সোনাগাজী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আওয়ামী লীগ নেতা মাকসুদ আলম, মাদ্রাসার ইংরেজির প্রভাষক আফছার উদ্দিন, মাদ্রাসাছাত্র জোবায়ের আহম্মেদ, জাবেদ হোসেন এবং উম্মে সুলতানা পপি।

ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার শাহাদাত হোসেন ওরফে শামীম (২০) পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার এমন বর্ণনা দিয়েছে। শাহাদাত সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার ফাজিল দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ওই মাদ্রাসার এবারের আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন নুসরাত। 

পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার জানান, “তারা দুটি কারণে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা করে। এর একটি হচ্ছে অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে মামলা করে ‘আলেম সমাজকে হেয় করা’। আর অপরটি হচ্ছে শাহাদত হোসেন শামীমের প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা।”

নুসরাত খুনিদের লক্ষ্যে হন গত ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ আনার পর থেকেই। ওই ঘটনায় নুসরাতের মা শিরিন আক্তার সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। এর পর থেকেই মামলা তুলে নেওয়ার জন্য নানাভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল পরিবারটিকে। তবে প্রতিবাদে অনড় ছিলেন নুসরাত। আগুন ধরিয়ে দেওয়ার আগ মুহূর্তেও তাঁকে মামলা তুলে নিতে চাপ দেওয়া হয়। কিন্তু নুসরাত তা মানেননি। পরবর্তী সময়ে অগ্নিদগ্ধ অবস্থায়ও তিনি প্রতিবাদ করে গেছেন। শরীরের ৮০ শতাংশ পোড়া নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন ধাকার পর মারা যান নুসরাত।

আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ সূত্রে তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেপ্তার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে দেখা করতে ৩ এপ্রিল যারা কারাগারে গিয়েছিল, অধ্যক্ষ তাদের সবার কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। এরপর তিনি আলাদাভাবে মাদ্রাসাছাত্র ও ‘সিরাজ উদদৌলা সাহেবের মুক্তি পরিষদ’ নামে গঠিত কমিটির আহ্বায়ক নুর উদ্দিন (২০), যুগ্ম আহ্বায়ক শাহাদাত হোসেন ওরফে শামীম (২০) এবং আরেক ছাত্রের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেন। তিনি তাদের মামলা তুলে নেওয়ার জন্য নুসরাতকে চাপ দিতে বলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি শাহাদাতের সঙ্গে একা কথা বলেন। তখন তিনি চাপে কাজ না হলে প্রয়োজনে নুসরাতকে হত্যার নির্দেশ দেন।

তদন্ত কর্মকর্তারা জানান জিজ্ঞাসাবাদে শামীম জানিয়েছেন, কারাগার থেকে ফেরার পর ওই দিন রাত সাড়ে ৯টায় মাদ্রাসার পশ্চিম হোস্টেলে তিনি, নুর উদ্দিন, মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের প্রধান আবদুল কাদেরসহ পাঁচজন সভা করেন। সেখানে কে বোরকা আনবে, কে কেরোসিন আনবে, কে কোথায় থাকবে, সে বিষয়ে পরিকল্পনা করা হয়। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয় অধ্যক্ষের জেঠাসের (স্ত্রীর বড় বোন) মেয়ে উম্মে সুলতানা পপিকে দিয়ে নুসরাতের বান্ধবী নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে এমনটা বলে তাকে ডেকে পাঠানো হবে।

জিজ্ঞাসাবাদে শাহাদাত হোসেন জানিয়েছেন, আন্দোলন ও বোরকা কেনার জন্য সোনাগাজী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মাকসুদ আলম তাদের ১০ হাজার টাকা এবং এক শিক্ষক ৫ হাজার টাকা দেন। এর মধ্যে ৫ হাজার টাকা তিনি নূর উদ্দিনকে দেন। আর তিনটি বোরকা কেনার জন্য তাঁর চাচাতো বোনের পালিত মেয়ে ও ওই মাদ্রাসার ছাত্রীকে দেন দুই হাজার টাকা।

নিউজওয়ান২৪.কম/এলএন

আরও পড়ুন
অপরাধ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত