ঢাকা, ০৩ জুলাই, ২০২৬
সর্বশেষ:

ইতিহাসে লোমহর্ষক মৃত্যুদণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১:৩৩, ৩০ নভেম্বর ২০১৮  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে মানুষ যেসব উপায় বের করেছিলো, তা ভাবলে আজও গা শিউরে ওঠে। জ্যান্ত মানুষকে পশুর সাথে এক বস্তায় বেধে পানিতে ফেলে দেয়া হতো, অপরাধীর পিঠ চিড়ে ফুসফুস টেনে বের করে আনা হতো। প্রাচীণ পারস্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রথাটি `শ্যাপিজম` নামে পরিচিত। দুইটি দাঁড় টানা নৌকার মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ফেলে পিষে স্যান্ডউইচ বানিয়ে মারা হতো। তারপর মৃতদেহে দুধ আর মধু ঢেলে পোকামাকড়কে দিয়ে খাওয়ানো হতো। মধ্যযুগে ইউরোপে ও চীনে চার হাত-পা চারটি ঘোড়ার সাথে বেধে ঘোড়াগুলোকে চারটি ভিন্ন দিকে দৌড় করানো হতো, সাজাপ্রাপ্তের শরীর চার খণ্ড হয়ে যেত। 
মৃত্যুদণ্ডে ব্যবহৃত আরো কিছু পদ্ধতি হলো-

গিলোটিনে শিরোচ্ছেদ:

গিলোটিনের উদ্ভব ঘটে ১৭৮৯ সালে, ফরাসি বিপ্লব শুরুর প্রাক্কালে। তখনকার প্যারিসের অত্যাচারী মহাজনদের শিরোচ্ছেদ করতে কুঠারের বদলে আধুনিক কোন অস্ত্রের প্রয়োজন হয়। এর ফলশ্রুতিতেই হয় গিলোটিনের আবিষ্কার। জোসেফ আইনেস গিলোটীন নামের এক ডাক্তার এই যন্ত্রটি আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি দেখলেন অন্য সব অস্ত্র যেমন- কুঠার এর মাধ্যমে শিরোচ্ছেদ করা বেশ অমানবিক। অনেক সময়েই ধড় থেকে এক কোপে মাথা আলাদা হয় না, যার ফলে সাজাপ্রাপ্তের আর্তনাদে করুণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। তাই তিনি এমন এক যন্ত্র আবিষ্কার করেন- যার মাধ্যমে চোখের পলকেই দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, যন্ত্রণাও অনেক কম হবে।একটি বেশ ভারী হেলানো ব্লেড কাঠের ফ্রেমের উপর রাখা মস্তকের গলা বরাবর পড়ে এক মুহূর্তেই ধড় থেকে মাথা আলাদা করে দিত। ডাক্তার গিলোটিনের নাম অনুসারেই এ অভিনব যন্ত্রের নাম রাখা হয় গিলোটিন। কিন্তু এভাবে মৃত্যুদণ্ড দেয়া কতটা মানবিক? ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, শিরোচ্ছেদের পর প্রাণীরা ৯ দশমিক ১৮ সেকেন্ড পর্যন্ত যন্ত্রণা অনুভব করতে পারে। ইঁদুর ও অন্যান্য প্রাণীর উপর ল্যাবরেটরিতে গিলোটিন এক্সপেরিমেন্ট করে এই ফলাফল পাওয়া যায়। সব প্রাণীর ক্ষেত্রেই শিরোচ্ছেদ পরবর্তী যন্ত্রণার সময়কাল মোটামুটি একই পাওয়া যায়। তাই ধারণা করা হয়, গিলোটিনে মৃত্যুর পর মানুষও প্রায় দশ সেকেন্ড যাবত মৃত্যু যন্ত্রণা পেয়ে থাকে। মৃত্যুদণ্ডের এই প্রাচীণ প্রথা এখনো কোনো কোনো দেশে প্রচলিত আছে। ২০১৭ সালে শুধু সৌদি আরবেই শিরোচ্ছেদ করে ১৪৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা:

বর্তমান বিশ্বে সর্বাধিক প্রচলিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতি হলো ফাঁসি। দুই উপায়ে কাউকে ফাঁসিতে ঝোলানোর রেওয়াজ রয়েছে- লঙ ড্রপ এবং শর্ট ড্রপ। লঙ ড্রপে দণ্ডিতকে উঁচু দিয়ে ফেলা ফেলা হয়, আর শর্ট ড্রপে উচ্চতা থাকে কম। উভয় ক্ষেত্রেই গলায় ফাঁস দিয়ে শ্বাস রোধ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মৃত্যুদণ্ডের জন্য এটি অন্যতম পীড়াদায়ক একটি পদ্ধতি। শর্ট ড্রপের চেয়ে লঙ ড্রপকে অনেক মানবিক উপায় বলে বিবেচনা করা হয়, কারণ এতে এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির ঘাড়ের দুই নম্বর হাড়টি ভেঙ্গে গিয়ে স্পাইনাল কর্ড আলাদা হয়ে রক্তচাপ শূন্যতে নেমে আসে। যদিও ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর ২০ মিনিট অবধি ভিকটিমের হৃদপিণ্ড সচল থাকতে পারে বলে জানা যায়। ফাঁস দেয়ার জন্য অনেক হিসেব নিকেশ করার প্রয়োজন হয়। উচ্চতা খুব বেশি বা কম হয়ে গেলে বেশ অসুবিধার সৃষ্টি হয়, সে ক্ষেত্রে ভিকটিমের স্পাইনাল কর্ড না ছিঁড়ে গিয়ে শুধু ঘাড় ভেঙ্গে গিয়ে অসম্ভব যন্ত্রণা শুরু হয়, কিন্তু মৃত্যু হয় না। আমেরিকায় ফাঁসি দেয়ার প্রথা চালু হয় ১৯৯৬ সালে।

ফায়ারিং স্কোয়াড:

সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রে অথবা মিলিটারি সাজা প্রাপ্তদের ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। তবে উত্তর কোরিয়া এবং অ্যামেরিকার উটাহ প্রদেশে এভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিধান রয়েছে। এক্ষেত্রে সাধারণত ভিকটিমকে একটি সিটে বসিয়ে মাথাটি ঢেকে দেয়া হয়। পাঁচজন বন্দুকধারী তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েন, কিন্তু একজনের বন্দুকে আবার কোন বুলেট থাকে না। ১৯৩৮ সালে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত এক ব্যক্তি ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর কালে তার শরীরের ইসিজি নেয়ার অনুমতি দেন। তাতে দেখা যায়, গুলি করার পর ১৫ সেকেন্ড তার হৃদপিণ্ড সচল ছিলো। তবে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার পর কতক্ষণ পর্যন্ত যন্ত্রণা অনুভূত হয় এ ব্যাপারে ২০১৫ তে পরিচালিত এক গবেষণা বলছে- মোটামুটি ৩০ সেকেন্ড, তারপরই পুরো পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসে চোখের সামনে।

ইলেকট্রিক চেয়ার:
মৃত্যুদণ্ডকে আরও মানবিক করার লক্ষ্যে ১৯ শতকের শেষ দিকে ইলেকট্রিক চেয়ারের আবিষ্কার হয়। ধারণা করা হতো ইলেকট্রিক শক দিলে অল্প কিছু মুহূর্ত পরেই মানুষের মৃত্যু ঘটে, কিন্তু প্র্যাক্টিকালি দেখা গেলো, এই প্রক্রিয়াটি খুবই কষ্টদায়ক এবং মোটেই দ্রুত মৃত্যু ঘটায় না। তাই বর্তমানে কোথাও ইলেকট্রিক চেয়ারে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় না বললেই চলে।

বর্তমান বিশ্বে অনেকেই মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে বেশ সোচ্চার। অমানবিক আচরণের বিচার অমানবিকতা দিয়ে করাকে অনেকেই যুক্তিসংগত মনে করেন না। সবচেয়ে সহজ হতো যদি ওষুধ প্রয়োগে মুহূর্তের মধ্যেই কারো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যেত। কিন্তু কোনো মেডিসিন কোম্পানিই এমন ওষুধ বানাতে আগ্রহী নয়, যেটি মানুষকে মেরে ফেলে।

নিউজওয়ান২৪/ইরু