NewsOne24

অটিজম: পরিবারের ওপর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব

বোরহান উদ্দিন

নিউজওয়ান২৪.কম

প্রকাশিত : ০৩:১০ পিএম, ২ নভেম্বর ২০১৬ বুধবার | আপডেট: ১২:৫৮ পিএম, ৪ নভেম্বর ২০১৬ শুক্রবার

অটিজম আক্রান্ত শিশুর বাবা-মায়ের অতলস্পর্শী মানসিক যাতনা-কষ্টের গভীরতাকে সম্মান করা উচিৎ আমাদের

অটিজম আক্রান্ত শিশুর বাবা-মায়ের অতলস্পর্শী মানসিক যাতনা-কষ্টের গভীরতাকে সম্মান করা উচিৎ আমাদের

সাধারণভাবে অটিস্টিক আক্রান্তরা তাদের সোশালাইজেশনে যে সব সমস্যায় পড়ে, সেগুলো হচ্ছে

১। তারা বুঝতে পারেনা তাদের চারপাশে কি হচ্ছে

২। তাদের কার্যক্রমের জন্যে কি হতে যাচ্ছে, বুঝতে না পারা

এ জন্যে তারা তাদের সোশালাইজেশনের সময় নিয়মিত উদ্বেগ এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। তাই তারা তখন তাদের ভেতরের উদ্বেগ এবং ভয় ও দ্বিধা দূর করার জন্যে কিছু স্ট্রেস রিডিউসিং অবসেসিভ আচরণ যেমন: ভয় বা উত্তেজনাবশত দু হাত নাড়ানো বা পাখির ডানার মত দোলানো, শরীর দুলাতে থাকা, একে ওকে ধাক্কা দেওয়া, লাথি মারা, কামড়ে দেওয়া বা ঘুষি মারা ইত্যাদি করতে থাকে।

অটিজম সাধারণত বাহিরে দৃশ্যমান বা শারীরিকভাবে বোঝা যায় না। তাই অনেক সময় অন্যান্য লোকজন কোনো অটিস্টিক শিশুর এসব আচরণ দেখে ধারনা করেন যে, শিশুটি দুষ্ট অথবা তার বাবা-মা তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যার্থ হচ্ছে। যার ফলে অনেক বাবা মা বিড়ম্বনা থেকে বাঁচতে তাদের অটিস্টিক শিশুকে পাবলিক প্লেসে নিয়ে যান না বা বাড়ির বের করতে চান না। এর ফলে অটিস্টিক শিশুটির সাথে সাথে তার ভাই বোনেরাও দিনে দিনে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং বাড়িতেই কার্যত বন্দী হয়ে যায়, যেটি তাদের সবার সামাজিকতা এবং মানসিকতায় দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

অটিজম আক্রান্তরা তাদের স্কুলে, সমাজে এবং যারা বড় তারা তাদের কার্যক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরণ ও মাত্রায় ব্যার্থতার পরিচয় দেয়। এটি দিনে দিনে তাদের মধ্যে হীনম্মন্যতা, আত্নবিশ্বাসের অভাব ইত্যাদি সমস্যা তৈরি করে। কারো কারো মধ্যে এজন্যে অতি উদ্বেগ, হতাশা, বিষন্নতাও তৈরি হয়। অনেক সময় অটিজম আক্রান্তরা তাদের আচরণজনিত কারণে সামাজিকভাবে নিগৃহীতও হয়- আর এ ধরণের নিগৃহীত হবার ঘটনা সবচে বেশি ঘটে তাদের ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব বা আত্নীয়দের দ্বারা।

আরও পড়ুন অটিস্টিক শিশুদের কমিউনিকেট করতে উৎসাহ দিন এই ৫ পদ্ধতিতে

অটিস্টিক আক্রান্তের বাবা মায়েরা সামাজিকভাবে অনেকসময় নিজেদের নিয়ে হতাশায় ভোগেন। পারিপার্শ্বিক সমাজ এবং পারিবারিকভাবেও তারা ‘হেয়’ হন। অটিস্টিক শিশুর জন্ম দেয়ায় কখনো নিজ পরিবারের কাছে, নিজ ভাইবোনদের কাছেও তাদের গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। দিনে দিনে তারা নিকটাত্মীয়দের থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। দুঃখজনক হলেও সত্য যে এসময় অনেক পারিবারিক অনুষ্ঠানসমুহে তাদের নিমন্ত্রণও জানানো হয়না। এর নেতিবাচক প্রভাব ওই শিশুর ওপর এবং তার অন্যান্য ভাই বোনের ওপরেও পড়ে।

এ ধরণের বাচ্চাদের প্রতিপালন খুব স্ট্রেসফুল (পীড়াদায়ক, কষ্টকর) হয়ে থাকে। সার্বিক সামাজিক প্রভাব এবং এর সাথে স্বীয় পারিবারিক পরিস্থিতির জন্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিবাহবিচ্ছেদের ন্যায় চরম অনাকাঙ্খিত ঘটনাও ঘটে। তখন বিচ্ছিন্ন পরিবারের অংশ হিসেবে এই অটিস্টিক শিশুটির সাধারণ চিকিৎসা তো দুরের কথা, জীবনধারণও দুরূহ হয়ে উঠে।

অটিস্টিক শিশুদের ঘুমের সমস্যা সবসময়ই থাকে। এ সমস্যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পরিবারের সদস্যদের ওপর। আবার শিশুটি যখন বয়ঃপ্রাপ্ত তখন উত্তেজিত হয়ে গেলে তাকে নিয়ন্ত্রণে আনাও খুব কঠিন হয়ে যায়। এসবে দিনে দিনে বাবা-মাও অনেকসময় নিজেদের মধ্যেই পরস্পর আইসোলেটেড (বিচ্ছিন্ন) হয়ে যায়।

আরও পড়ুন প্রতিবন্ধী শিশু বহিষ্কার: স্কুলের নামে মামলা অ্যাটর্নি জেনারেলের

এর পাশাপাশি পরিবারের অন্য ভাই-বোনের জন্যেও বাসার পরিবেশ ক্ষেত্রবিশেষে স্ট্রেসফুল (পীড়াদায়ক, অসহনীয়) হয়ে যায়। তাদের সামাজিক যোগাযোগের হার কমে যায় এবং তারাও বিভিন্ন সামাজিক বিপত্তিকর প্রশ্ন এড়াতে বা বিড়ম্বনা এড়াতে নিজেরা স্বেচ্ছায় আইসোলেটেড (সমাজ বিচ্ছিন্ন) হতে থাকে। তারাও কখনো কখনো তাদের অটিস্টিক ভাই বা বোনটির কাছ থেকে মুক্তি চাবে, যেমন একটু বড় হতেই হোস্টেলে চলে যেতে চাইবে বা অন্য শহরে গিয়ে পড়ালেখা করতে চাইবে।

উপরে বর্নিত আলোচনাটুকু শুধু তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার আলোকে এবং কিছু পরিবারের বিচ্ছিন্ন কিছু অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লেখা হয়েছে। মূলত একটি অটিস্টিক শিশুর পিতামাতার নেহায়েত অল্প কিছু অব্যক্ত কষ্টের কথাই এখানে আলোচনা করা হয়েছে।

(অনুগ্রহপূর্বক কেউ এতে আহত হবেন না, বরং আপনার আশেপাশের কোনো পরিবারে এরকম কোনো সন্তান থাকলে আজ থেকে সে পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা এবং ভালবাসার হাতটি বাড়িয়ে দিন)। [email protected]

নিউজওয়ান২৪.কম/একে