ঢাকা, ১৭ জানুয়ারি, ২০২০
সর্বশেষ:
জরুরি প্রয়োজনে কল করুন- ৯৯৯

ভারতকে ‘আলবিদা’ জানালো নিউজিল্যান্ড

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২:০০, ১০ জুলাই ২০১৯  

বিশ্বকাপ ক্রিকেটের প্রথম সেমিফাইনালে দোর্দণ্ড প্রতাপ ভারতকে বিদায় করে দিয়েছে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শক্তির দল নিউজিল্যান্ড। বৃষ্টির কারণে প্রথমবারের মতো দ্বিতীয় দিনে গড়ানো বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সেমিফাইনালের শেষদিনে বুধবার ১৮ রানে পরাজিত হয় ভারত। এর ফলে ফাইনালে পৌঁছে গেল নিউজিল্যান্ড।

২৪০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নিজেদের ইনিংস শুরু করে একের পর এক প্রচণ্ড কয়েকটি ধাক্কা হজম করতে হয় ভারতকে। নিউজিল্যান্ডের বোলারদের কর্কশ তবে দৃষ্টিনন্দন সুইং বলে কুপোকাত হতে থাকেন টপঅর্ডারের ব্যাটসম্যানরা। ফর্মের শিখরে থাকা রোহিত শর্মা দ্বিতীয় ওভারেই বিদায় নেন মাত্র এক রান করে। মেট হেনরির সুইং বল সামলাতে পারেননি তিনি। বলটি তার ব্যাটে চুমু খেয়ে গিয় আশ্রয় নেয় উইকেটের পেছনে থাকা টম লেথামের গ্লাভসে। ভারতীয় সমর্থকরা যখন রোহিতের বিদায়টাকে একটা সাময়িক আঘাত বলে মনে করা শুরু করছেন ঠিক তখনি, মানে পরের ওভারেই ট্রেন্ট বোল্টের আঘাতে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন অনেকের মতে বর্তমান দুনিয়ার সবসেরা ব্যাটসম্যান বিরাট কোহলি। মাত্র ১ রান ঝুলিতে ভরতে না ভরতেই বুক মোচড়ানো এলবিডব্লিউর শিকার হন তিনি। রিভিউ নিয়েও সেই মরণ ছোবল থেকে বাঁচতে পারেননি।  

এর পরের ওভারেই উদ্বোধনী জুটির অপর ব্যাটসম্যান কেএল রাহুল কট বিহাইন্ড হন। মেট হেনরির দুর্দান্ত বল সামলাতে গিয়ে বেসামাল হন। ইনিংসের উনিসতম বলে রাহুল যখন প্যাভিলিয়নে ফেরেন তখন স্কোরবোর্ডে ভারতীয় দলের মোট রান ছিল মাত্র ৫, কিন্তু এরই মধ্যে নাই টপঅর্ডারের তিন তিনজন বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যান। এসময়েই ম্যাচের ভবিষ্যৎ অনেকটা বুঝে নেন কেউ কেউ। প্যাভিলিয়নে বসে থাকা বিরাট কোহলির বিমর্ষ মুখমণ্ডল যেন তারই ইঙ্গিত দিচ্ছিল। কারণ, টপ অর্ডারের তিন ব্যাটসম্যান রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি আর কেএল রাহুলের সাকুল্যে রান দাঁড়ায় মাত্র তিন- তারা তিনজনের প্রত্যেকে রান করেছেন মাত্র একটি করে। চলতি বিশ্বকাপে পাঁচ পাঁচটি সেঞ্চুরি করে বিশ্বরেকর্ড করা রোহিত শর্মা কিনা সেমিফাইনালে করলেন মাত্র এক রান! ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে কোনো ম্যাচেই টপ অর্ডারের তিন ব্যাটসম্যান ১টি করে রান করে আউট হননি এর আগে। ৪৮ বছরের ওয়ানডে ইতিহাসের খাতায় এমন ঘটনা এই প্রথম লেখা হবে।
ভারতের ইনিংসের শুরুতে নিউজিল্যান্ডের পেসাররা এমন আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন যে মনে হচ্ছিল পুরো টিম ইন্ডিয়া হয়তো এক শ রানও করতে পারবে না। লোকেশ রাহুল, রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি— অতি অর্প পুঁজিতে টপ অর্ডারের এ তিন স্তম্ভকে হারানোর পর জুটি গড়ার চেষ্টায় খণ্ড-খণ্ড লড়াই করেছে ভারত। তাদের লড়াই আশার আলো দেখে যখ পিচে এসে রবীন্দ্র জাদেজা ধোনির সঙ্গে যোগ দেন। ৩১তম ওভারে জুটি বাঁধেন তারা। তখন পর্যন্ত ১১৪ বলে ১৪৬ রানের দূরত্বে পিছিয়ে ভারত। হাতে ৪ উইকেট মাত্র। সপ্তম উইকেট জুটিতে ১১৬ রানের জুটি গড়ে ম্যাচের ফল ঘুরিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ধোনি-জাদেজা জুটি।

কিন্তু ইনিংসের শুরুর মতো ভারতের শেষটুকু হুড়মুড় করে গুটিয়ে যাওয়া শুরু করে ৪৭.৫ ওভার থেকে। বোল্টকে তুলে মারতে গিয়ে ক্যাচবন্দি হন জাদেজা (৫৯ বলে ৭৭)। ওই ওভার শেষে জয়ের জন্য ভারতের দরকার ছিল ১২ বলে ৩১ রান। ৪৯তম ওভারে এসে ম্যাচের ভাগ্য হেলে যায় কিউইদের দিকে। লকি ফার্গুসনের ওই ওভারে রান আউট হন ধোনি (৭২ বলে ৫০)। আর শেষ বলে ভুবনেশ্বর কুমারকে আউট করেন ফার্গুসন। এতে হাতে ১ উইকেট রেখে শেষ ওভারে ২৩ রান তোলার প্রায় অসম্ভব ‘মিশন ইম্পসিবল’-এর মুখে পড়ে যায় ভারত। নিউজিল্যান্ডার জিমি নিশাম ম্যাচের শেষ ওভারের তৃতীয় বলে যুজবেন্দ্র চাহালকে বিদায় করে কিউইদের ফাইনাল নিশ্চিত করেন। আর চাহালের বিদায়ের সঙ্গে বিশ্বাকাপ থেকে ভারতকেও আলবিদা জানিয়ে দেয় নিউজিল্যান্ড। 

এবারের বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালের এ ম্যাচটা মাঠে গড়িয়েছে গতকাল মঙ্গলবার। সেদিনের বৃষ্টির জন্য ৪৬.১ ওভারে ৫ উইকেটে ২১১ রান তোলা নিউজিল্যান্ড আজ ইনিংসের বাকি ৩.৫ ওভার বল করে মোট ২৩৯ রান তুলে। উইকেটে মুভমেন্ট থাকলেও এ রান তাড়া করা তেমন কঠিন হওয়ার কথা ছিল না ভারতীয় শক্তিশালী ব্যাটিংয়ের জন্য। কিন্তু সুইং সহায়ক কন্ডিশনের পুরো ফায়দা তুলে ৪ ওভারের মধ্যে কিউিইরা ফিরিয়েছে ভারতের আগুনে ফর্মে থাকা তিন ব্যাটসম্যান রোহিত, বিরাট আর রাহুলকে। এরপরই এবারের বিশ্বাকাপে নিজেদের পারফম্যেন্সের বিচারে অপ্রত্যাশিত চরম পরীক্ষায় পড়ে ভারতীয়রা। এসময় অনেকেরই মনে পড়ে আত্মবিশ্বাসের চরম স্তরে থাকা কোহলি-ধোনিদের ইংল্যান্ডের বিপক্ষের রহস্যজনক পারফর্মেন্স আর হারের ঘটনাটি। সেদিনের ম্যাজচ দেখে মনে হচ্ছিল এই দলটি এতই সক্ষম যে যে কোনো ম্যাচ তারা ইচ্ছা করে হারতে বা জিততে পারে। কিন্তু বুধবার দিনেশ কার্তিক, ঋষভ পন্ত, হার্দিক পাণ্ডিয়ারা চরম সঙ্কট মোকাবেলায় চূড়ান্ত চেষ্টা করলেও একে একে আউট হয়েছেন ধৈর্য হারিয়ে।

শেষ পর্যন্ত অবশ্য জাদেজা এসে জমিয়ে তুলেছিলেন ম্যাচ। সেমিফাইনালের আগে তাঁকে খেলানো হয়েছে শুধু শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। আজ ব্যাটিংয়ে নেমেছিলেন ভীষণ চাপের মুহূর্তে। উইকেটের ধোনি তখন বরফশীতল। এক রান-এক রান নিয়ে খেলিয়েছেন জাদেজাকে দিয়ে। আর জাদেজা আস্কিং রেট কমানোর লক্ষ্যে করেছেন সুযোগের সদ্ব্যবহার করা ব্যাটিং। বাজে বল পেলেই মাঠের বাইরে পাঠিয়েছেন, জাগিয়ে তুলেছেন ভারতের আশা। দুজন জুটি বাঁধার সময় আস্কিং রেট ছিল ৭.৬৮। ৪০তম ওভার শেষে সেটাই দাঁড়ায় ৯-এ। ৬০ বলে দরকার ৯০ রান। এখান থেকে ম্যাচটা যে কারও হতে পারত। কিন্তু উইকেটে ‘ফিনিশিং’ মাস্টার ধোনি থাকায় এ সময় মানসিক লড়াইয়ে ভারত অবশ্যই কিছুটা এগিয়ে ছিল। অপরদিকে, নিউজিল্যান্ড যে প্রতিপক্ষের জুটি ভাঙার সুযোগ পায়নি তা নয়। জিমি নিশামের করা ৪৪তম ওভারে জাদেজার ক্যাচ নেওয়ার দুটি ‘হাফ চান্স’ পায় তারা। কিন্তু হাওয়ায় ভাসলেও বল ফিল্ডারের তালুর নাগাল পায়নি শেষ তক। তখন তো আরও মনে হচ্ছিল, আজ জাদেজারই দিন। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ নেমে এসেছে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে। শেষ ১৮ বলে দরকার ছিল ৩৭ রান। ম্যাচের এ পর্যায়েও ধোনি যে প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই শান্ত ছিলেন সেটি বুঝিয়ে দেবে পরিসংখ্যান—৬৫ বলে ৩৮ রানে অপরাজিত। ইংল্যান্ড ম্যাচের গতিজড়তার প্রভাব! হতে পারে। তবে এমন মুহূর্তেও বারবার সিঙ্গেল নিয়ে জাদেজাকে হাত খুলে খেলার সুযোগ করে দিয়েছেন ধোনি। ৪৮তম ওভারের পঞ্চম বলে জাদেজা ফিরলে আবারও চাপে পড়ে যায় ভারত। এখান থেকে দলকে জেতানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন ধোনি। কিন্তু ততক্ষণে দেরিটা বেশিই হয়ে গিয়েছিল। ফার্গুসনের প্রথম বলে ছক্কা মারলেও ওভারপ্রতি গড়ে ২৩ রানের চাপটা নিতে পারেননি ধোনি। উল্টো, চাপের মুহূর্তে ভালো বল করে নিউজিল্যান্ডই বুঝিয়ে দিয়েছে- তারাও কম কঠিনপাত্র নয়। গত বিশ্বকাপের ফাইনালের পর এবারেও ফাইনাল খেলবেই তারা। হয়তো কাপটাও এবার তাদের হাতেই শোভা পাবে! পেতেও পারে- একেবারে অসম্ভব তো নয়।

নিউজওয়ান২৪.কম/আরকে