ঢাকা, ০৩ আগস্ট, ২০২০
সর্বশেষ:
সেহরি ও ইফতারের সময় সূচি : ঢাকায় প্রথম রোজার সেহরির শেষ সময় রাত ৪টা ৫ মিনিটে আর ইফতার হবে সন্ধ্যা ৬টা ২৮ মিনিটে। আইইডিসিআর এর করোনা কন্ট্রোল রুম (০১৭০০৭০৫৭৩৭) অথবা হটলাইন নম্বরে (০১৯৩৭১১০০১১, ০১৯৩৭০০০০১১, ০১৯২৭৭১১৭৮৪, ০১৯২৭৭১১৭৮৫, ০১৯৪৪৩৩৩২২২, ০১৫৫০০৬৪৯০১–০৫) যোগাযোগ করা যাবে। এ ছাড়া করোনাসংক্রান্ত তথ্য জানতে বা সহযোগিতা পেতে স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ এবং ৩৩৩ নম্বরে ফোন করা যাবে। অনলাইনে করোনা নিয়ে যোগাযোগ করতে আইইডিসিআরের ই-মেইল [email protected] এবং ফেসবুক পেজে (Iedcr,COVID19 Control Room) যোগাযোগ করা যাবে। জরুরি প্রয়োজনে কল করুন- ৯৯৯

বাংলাদেশের পক্ষে পাকিস্তানি বিমান আটক করেছিলেন এই ফরাসি নাগরিক

সাতরং ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:৫৫, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯  

জঁ ক্যা ও সেই বিমান- ফাইল ফটো

জঁ ক্যা ও সেই বিমান- ফাইল ফটো

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিদেশি বন্ধুদের অবদান কম নয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন ও সহযোগিতা জুগিয়েছেন। সেই তালিকায় ছিলেন ফরাসি নাগরিকরাও। 

বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য অনেকে ফরাসি কবিতা-কলাম লিখেছেন, এদেশের কবিদের মুক্তিযুদ্ধের কবিতা ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করে ছেপেছেন। কিন্তু সবচেয়ে অবাক করা কাজটি করেছিলেন ২৮ বছর বয়সী জঁ ক্যা। পাকিস্তান এয়ারলাইনসের (পিআইএ) একটি বিমান দীর্ঘ আট ঘণ্টার আটকে রেখেছিলেন তিনি। প্যারিসের সব পুলিশ যেন সেই দিন অরলি বিমানবন্দরে এসে হাজির হয়েছিল। তিনি যা করেছিলেন সবই বাংলাদেশিদের জন্যই।

কী করেছিলেন জঁ?
একাত্তরের ৩ ডিসেম্বর। প্যারিসের অর্লি বিমানবন্দর। পরিচ্ছন্ন ও ঝলমলে বিমানবন্দরটি আজ একটু বেশিই ব্যস্ত। এয়ারপোর্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছেন; দেখছেন কোথাও কোনো ক্রুটি আছে কি-না। কারণও আছে, রাষ্ট্রীয় সফরে ফ্রান্সে আসছেন জার্মান ভাইস চ্যান্সেলর। বেশ কিছু চুক্তি হবে দু’দেশের মধ্যে; এমনকী যেকোনো নতুন ঘোষণাও আসতে পারে। তাই স্থানীয় তো বটেই, বিশ্বের বাঘা বাঘা সংবাকর্মীদেরও চোখ এই বিমানবন্দরেই।

সকাল ১০টা। সাদামাট একটা ট্যাক্সি এসে ভিড়লো বিমানবন্দরের বাইরে। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো নীল জ্যাকেট, পিঠে ঝোলানো ব্যাকপ্যাকওয়ালা এক যুবক। নিরাপত্তাকর্মীরাও বেশ সতর্ক, কারণ তো বলাই হলো আগে। ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে বিমানবন্দরের টার্মিনালের দিকে হাঁটা ধরলো যুবকটি। ঠিক যুবক নয়, তরুণ বলা চলে! অসম্ভব রকমের শিশুতোষ চেহারা ২৮ বছরের মানুষটির। ইমিগ্রেশনের প্রবেশপথে চেক করার জন্য দাঁড় করানো হলো তাকে। কিন্তু নিরাপত্তারক্ষী সন্দেহজনক কিছুই পেলেন না পুরো শরীর হাতড়ে। কিন্তু সেই যুবকের কোমর, অন্তর্বাস আর মোজার ভেতরে গুঁজে রাখা ছিল রিভলভারের আলাদা আলাদা অংশ!

যুবকের নাম জঁ ক্যা। অন্য দশজনের মতো তিনিও অপেক্ষা করছেন, কখন ছাড়বে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের (পিআইএ) ‘সিটি অব কুমিল্লা’ নামে বোয়িং-৭২০বি বিমানটি। কিছুক্ষণ পর সেই বিমানে যাত্রীরা তখন ধীরেসুস্থে উঠে বসছেন, সংখ্যাটা সব মিলিয়ে ত্রিশ জনের মতো। নিয়ম মোতাবেক পাইলট সবকিছু দেখেশুনে নিচ্ছেন। এদিকে সকালের মিষ্টি রোদ ছড়িয়ে পড়েছে অর্লি এয়ারপোর্টে।

জঁ ক্যা প্রবেশ করলেন সেই বিমানে। ঘড়ির কাঁটা দেখে নিলেন, বেলা তখন ১১টা ৫০ মিনিট। পাইলট আকাশে ওড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিমান চালু করতেই পকেট থেকে পিস্তল বের করে জঁ ক্যা ইঞ্জিন বন্ধ করার নির্দেশ দেন। কেউ নির্দেশ অমান্য করলে সঙ্গে থাকা বোমা দিয়ে পুরো বিমানবন্দর উড়িয়ে দেয়ারও হুমকি দেন তিনি। বিমানের ভেতরে কী ঘটছে পুরো বিমানবন্দর জানলো কিছুক্ষণ পর। রানওয়েতে দাঁড়ানো পিআইএ-৭১১ বিমানটা থেকে একটা মেসেজ এসেছে কন্ট্রোলরুমে- ‘এই বিমানটা আমি ছিনতাই করেছি, আমার কথা না শুনলে পুরো বিমান উড়িয়ে দেবো আমি। আমার ব্যাগে বোমা আছে!’

পাইলটের ওয়ারলেস কেড়ে নিয়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মাধ্যমে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে জঁ নির্দেশ দিলেন- বিমানটিতে ২০ টন ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী তুলতে বলেন। সেগুলো যুদ্ধাহত ও বাংলাদেশি শরণার্থীদের কাছে পৌঁছে দেয়ারও নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘আমার এই দাবি নিয়ে কোনো আপস চলবে না।’ দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা ধরে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু জঁ ক্যা তার সিদ্ধান্তে অনঢ়।

দাবি মেনে নেয়ার ফাঁদে জঁ
জেনে রাখা ভালো, জঁ কোনো প্রফেশনাল হাইজ্যাকার নন। যুদ্ধাহত বাংলাদেশিদের সাহায্য করার অন্য কোনো উপায় হয়তো জানা ছিল না তার কাছে। বিমানের কোনো যাত্রীর সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করেননি তিনি, সে পাকিস্তানি হলেও না। বিকেল সোয়া পাঁচটা নাগাদ ক্যার দাবি মেনে নিলো নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ। ওষুধে ভর্তি একটা বড় ট্রাক এসে দাঁড়ালো রানওয়েতে, বিমানের কার্গোতে তোলা হতে লাগলো সেগুলো। রেডিওতে জানানো হলো, এখানে ক্যার চাহিদার অর্ধেকটা আছে। বাকি অর্ধেক আরেকটা ট্রাকে করে আনা হচ্ছে। সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ সেটাও এসে দাঁড়ালো বিমানের পাশে। প্রথম ট্রাকটা আসার পরেই প্রতিশ্রুতি মোতাবেক আটজন জিম্মিকে মুক্তি দিয়েছিলেন ক্যা। নারী আর শিশুরাই অগ্রাধিকার পেয়েছিলেন এক্ষেত্রে।

ততক্ষণে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এই খবর। ফ্রান্সসহ বিশ্বের প্রভাবশালী টেলিভিশন চ্যানেলগুলো কিছুক্ষণ পরপর ঘটনার হালনাগাদ সংবাদ দিতে থাকল। বিশ্বজুড়ে চলা যুদ্ধবিরোধী ও মানবতার পক্ষের আন্দোলনকারীদের কাছে জঁ নামের ওই বাবরি দোলানো যুবক রীতিমতো হিরো বনে গেলেন। তার সঙ্গে দেখা করতে ফ্রান্সের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনের নেতারা অরলি বিমানবন্দরে এসে জড়ো হতে থাকলেন। তাদের কেউ কেউ গ্রেফতারও হলেন। এর মধ্যে ছিলেন ভারতবর্ষে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম পুরোধা যশোরের বিপ্লবী বাঘা যতিনের নাতি পৃত্থিন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। তিনি আন্দ্রে মারলোর প্রচেষ্টায় থানা থেকে ছাড়া পান।

জঁ ক্যা’র গ্রেফতার হওয়ার খবরও সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল

ঘটনায় ফিরে যাই, দাবি মেনে নেয়াটা ছিল এক ধরনের ফাঁদ। বেশ ভালোভাবেই সেটা সাজিয়েছিল ফরাসি সরকার। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘অর্ডি দ্য মানতে’র সহায়তায় বিমানবন্দরে দু’টি ওষুধভর্তি গাড়ি নিয়ে হাজির হয়। ওই গাড়ির চালক ও স্বেচ্ছাসেবকের পোশাক পরে বিমানটিতে প্রবেশ করেন ফরাসি পুলিশের বিশেষ শাখার চার সদস্য। তারা বিমানে তোলা ওষুধের বাক্সে পেনিসিলিন রয়েছে বলে জানান। এসব ওষুধ বিমানের ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় সাজিয়ে রাখার ভান করে তারা সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা ওষুধের বাক্স নামানোতে সহায়তার নাম করে জঁ ক্যার হাতে একটি বাক্স তুলে দেন। এরপরই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন পুলিশ সদস্যরা। একপর্যায়ে রাত ৮টায় জঁ ক্যা পুলিশের হাতে আটক হন। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় অরলি পুলিশ স্টেশনে। সেখানে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জঁ জানান, তিনি ইচ্ছে করেই এই বিমান ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেন। বাংলাদেশের মানুষকে সাহয্য করার জন্যই এত কাণ্ড ঘটিয়েছেন তিনি!

সেই ওষুধ কি বাংলাদেশে এসেছিল?
জঁ আত্মবিশ্বাসের কারণে অনেকখানি সফল হয়েছেন, তবে শেষ মুহূর্তে এসে ধরা পড়েন। ফরাসি এই যুবকের পরিকল্পনার কথা শুনে ওষুধ সামগ্রীগুলো ঠিকই বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল। তবে সেই খাদ্রসামগ্রী ও ওষুধ যখন বাংলাদেশে পৌঁছায়, তখন স্বাধীনতা সংগ্রামে বিজয় প্রায় নিশ্চিত করে ফেলেছে বাংলাদেশ। বিমান ছিনতাইয়ের অভিযোগ প্রমাণীত হওয়ায় আদালত জঁ ক্যাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল। তবে ১৯৭৩ সালেই জেল থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন জঁ ক্যা। তার হয়ে মামলা লড়েছিলেন বাঘা বাঘা সব আইনজীবি; এমনকি তার আদর্শিক গুরু আঁদ্রে মার্লো স্বয়ং আদালতে হাজির হয়েছিলেন তার পক্ষে সাক্ষী দিতে!

পুলিশের কাছে আটক জঁ ক্যা; ডানে নিউ ইংর্ক টাইমস এর খবর

একজন জঁ ক্যা
১৯৪৩ সালের ৫ জানুয়ারি জঁ ক্যা’র জন্ম; আলজেরিয়াতে। তবে জন্মস্থলে থাকা হয়নি সেভাবে। বাবা ছিলেন সামরিক কর্মকর্তা, তার সঙ্গে ক্যার পুরো পরিবার স্থায়ীভাবে বাস করা শুরু করেন ফ্রান্সে। জঁ ক্যা আর তার এক ভাইও ফরাসি সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন, কিন্ত একটা সময়ে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছা-অবসর নেন জঁ। মূলত তিনি উড়তে চাইতেন বাধনহারা পাখির মতো। তিনি পড়তে চাইতেন, লিখতে চাইতেন, কলমের কালিতে মনের ভাবগুলো ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করতেন। ছোটবেলা থেকেই জঁ ক্যা খানিকটা একগুঁয়ে ছিলেন, যেটা ভালো বুঝতেন সেটাই করতে চাইতেন।

জঁ ক্যা কখনো বাংলাদেশে আসেননি। যে দেশটার জন্যে তিনি জীবন বাজি রেখে এমন আত্মত্যাগ করেছিলেন; সেই দেশটা দেখতে কেমন, সেখানকার মানুষগুলো কেমন সেটা জানা হয়নি তার। মানবতার ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন তিনি, হাজার মাইল দূরের লাখো মানুষের অসহায়ত্ব তার মনে ঝড় তুলেছিল। তিনি কিছু একটা করতে চেয়েছিলেন। তিনি আলোড়ন সৃষ্টি করে ফেলেছিলেন বিশ্বজুড়ে। হয়তো তার কর্মপন্থাটা সঠিক ছিল না, কিন্ত সেই মূহুর্তে এটা ছাড়া অন্য কিছু করারও ছিল না তার! বিস্ময়করভাবে জঁর মৃত্যুও হয়েছিল আমাদের বিজয়ের মাস ডিসেম্বরেই। দিনটি ছিল ২৩ ডিসেম্বর।

সূত্র: ডেইলি বাংলাদেশ

নিউজওয়ান২৪.কম/এমজেড