ঢাকা, ১১ নভেম্বর, ২০১৯
সর্বশেষ:
জরুরি প্রয়োজনে কল করুন- ৯৯৯ আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন ডিসেম্বরে হেল্পলাইন ১৬২৬৩ এ কল করলেই ডাক্তারের পরামর্শ

ঢাকা’র ইতিহাস: (পর্ব-২)

সাতরং

প্রকাশিত: ১১:৫০, ১৭ এপ্রিল ২০১৯  

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

ঢাকা (ইংরেজি: Dhaka; ১৯৮২ সালের পূর্বে Dacca নামে লেখা হত) বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন একটি শহর এবং বর্তমানে বাংলাদেশের রাজধানী।

বস্ত্র মসলিন, জামদানি, কসিদা বাঙ্গালার অন্যতম প্রসিদ্ধ বস্ত্র। মুর্শিদাবাদের নবাবদের জন্য তৈরি করা হতো এসব সর্বোৎকৃষ্ট জামদানি। নানা রকম জামদানির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- তোড়াদার, কারেলা, বুটিদার, তেরছা, জলবার, পাল্লাহাজার, মেল, দুবলিজাল, ছাওয়াল, বাল আর, ডুরিয়া, গেদা ও সাবুরগা।

জামদানি কাপড়ের বুননশৈলী এক চেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন মোগল গভর্নমেন্ট। জামদানি বুনন করতেন ঢাকা আড়ংয়ের তন্তুবায়রা। এজন্য ঢাকার সদর মলমল খাস কুঠীর দারোগা তন্তুরায়দের দাদন দিয়ে রাখা হতো। কুঠিতে অল্প পরিমাণে জামদানি প্রস্তুত হতো।  ঢাকা শহর ছাড়াও নাস্তি, ডেমরা, ধামরাই, কাচপুর, সিদ্ধিরগঞ্জে জামদানি তৈরি করা হত।

মলমলখাস মসলিন প্রস্তুত করার জন্য সুবাদারদের নিয়োজিত তন্তুবায়রা ঢাকা ও সোনারগাঁয়ের কুঠিতে অবস্থান করতেন। তাদের কাজ পর্যবেক্ষণের জন্য মলমলখাস কুঠির অধ্যক্ষ রূপে দারোগা নিয়োজিত ছিল। কুঠির তন্তুবায়দের নির্দিষ্ট সময়ে কাজে যোগ দিতে হত। তাদেরকে কঠোর নজড়দারিতে রাখতেন দারোগা।

বিভিন্ন প্রকার মসলিনের মধ্যে মলমলখাসই সবচেয়ে বেশি মনোরম। উৎকৃষ্টতায় দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে ছিল আবরোয়, সব্নম, সরকার আলি, তুঞ্জেব।

১৮৬২ খ্রীস্টাব্দে বিলেতে শিল্প প্রদর্শনী হয়। সেখানে ইউরোপজাত মসলিনের সঙ্গে ঢাকাই মসলিনের তুলনা করা হয়। ঢাকাই মসলিনই সর্বশ্রেষ্ট বলে স্বীকৃতি পেয়েছিল।

মসলিনের ছিটসমূহ: নন্দনসাহা, আনারদানা, কবুতরখুপী, সাকুতা, পাছদার, কুন্তিদার প্রভৃতি।

বস্ত্র তন্তুবায়রা নিজ নিজ বাড়িতেই মসলিন বুনন করতেন। কিন্তু তন্তুবায়রা ৩ গিনির বেশি দামে মসলিন বিক্রি করতে পারতেন না। এজন্য ইউরোপীয় ও দেশীয় বণিকসম্প্রদায় মসলিন ব্যবসায়ের জন্য দালালের সহায়তা নিতে বাধ্য হতেন। তন্তুবায়রা ‘ছাপ্পা জামদানি’ নামে এক প্রকার কর প্রদান করতেন। ১৭৯২ সালে এই কর রহিত করা হয়েছিল।

কিন্তু তন্তুবায়রা নবাবী কর্মচারীদের দ্বারা অত্যাচারের শিকার হতেন। নবাব সিরাজউদ্দৌলার সময়ে মলমলখাসকুঠির কর্মচারীরা তন্তুবায়দের শ্রমলব্ধ আয়ের শতকরা পঁচিশ শতাংশ কেটে নিতেন। উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিতে চাইতেন না আবার কাজের সময় বন্দি অবস্থায় সময় পার করতে বাধ্য হতেন।

আরো পড়ুন>>> ঢাকা’র ইতিহাস (পর্ব-১) 

ঢাকা জেলার নানা স্থানে আরো যেসব বস্ত্র তৈরি হতো তারমধ্যে অন্যতম- বাফ্তা, বুন্নি, একপাট্টা ও জোর, হাম্মাম, লুঙ্গী, কসিদা।

বুটাতোলা মসলিন কসিদা নামে পরিচিত। মক্কার নিকটবর্তী মানাক নামক স্থানে বিপুল পরিমাণে কসিদা বস্ত্র বিক্রি হত। আরব, পারস্য, তুরস্কের সৈন্যদের শিরস্ত্রাণ ও ফতুয়া, মহিলাদের ঘাঘরা এই কাসিদা বস্ত্র থেকে প্রস্তুত হয়। ৫০-৬০ রকমের কসিদা বস্ত্র তৈরি করা হতো। প্রতিটি কসিদা বিক্রি হত ৫০০ টাকা মূল্যে।

ঢাকা জেলার প্রতি তন্তুরায় পল্লীতেই ঘরের কাজ শেষ করে নারীরা কসিদা বস্ত্র বুনন করতেন। মুসলিম নারী অধিকহারে এই কাজে যুক্ত ছিলেন। সম্ভ্রান্ত বংশীয় নারীরাও বস্ত্র বুননের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই কাজ না পারলে নারীরা উপহাসের পাত্রী হতেন। বস্ত্র বুননে বিশেষ দক্ষতা দেখানোর প্রবণতা ছিল। সে সময় নারীরা প্রতি মাসে ৪ থেকে ৮ টাকা উপর্জন করতেন।

কসিদা বস্ত্র সরবরাহের জন্য ‘ওস্তাগর’ ও ‘ওস্তানী’ মহাজনদের সঙ্গে চুক্তি করতেন। কসিদার নক্শা পারস্য দেশীয় জনগণের অভিরুচি অনুযায়ী অঙ্কিত হতো। তুরস্ক রাজ্যের অবণতির সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার কসিদা বস্ত্রের কদর কমতে থাকে। পরবর্তীতে তুরস্কের নারীরা নয় কেবলমাত্র প্রধান সৈনিক পুরুষরাই কসিদার শিরস্ত্রাণ ব্যবহারের অধিকারী হতেন।

কিছুকাল পরে, মুহাম্মদ আলি পাশা ইজিপ্টে কসিদা বুনন চালু করতে চেয়েছিলেন। এই জন্য ঢাকা থেকে অনেক তসর সেখানে পাঠিয়েছিলেন কিন্তু এই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছিল। ফলে সেই তসর ঢাকাতে ফেরত আসে।

১৮৪০ খ্রীস্টাব্দে ১ লাখ ২০ হাজার খণ্ড কসিদা বস্ত্র ঢাকা থেকে বিভিন্ন প্রদেশে রফতানি হয়েছিল। ১৮৯৫ সনে নব্বই হাজার টাকার কসিদা বস্ত্র বিক্রি হয়েছিল। ১৮৯৬ সনে কেবল মাত্র আরব দেশেই ২লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকার বস্ত্র রফতানি করা হয়েছিল।

ঢাকা ছাড়াও সানেরা, বিলিশ্বর, মাতাইল, দাগর অঞ্চলে মুসলিম নারীরা কসিদা প্রস্তুত করতেন। ঢাকা নগরী ও মাতাইল গ্রামে অধিকহারে কসিদা প্রস্তুত হতো।

ঢাকার বস্ত্র ব্যবসা ছিল হিন্দু, মোগল, পাঠান, আরমাণী, গ্রীক, পর্তুগীজ, ইংরেজ, ফরাসী ও দিনেমার বণিকদের হাতে। এই বাণিজ্য দেশীয় দালালদের মধ্যস্থতায় সম্পন্ন হতো। ইংরেজ কোম্পানীর কাছে ১৭৭৬ খ্রীস্টাব্দে দাদনের টাকা বেশি পরিমাণে বাকী পড়ে যায়। তন্তুবায়রা এক বছরে যে পরিমাণ টাকার বস্ত্র দিতে পারবে তার থেকে বেশি পরিমাণে দাদন দেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে তন্তুবায়রা কোম্পানীর নিকট দায়বদ্ধ হয়ে যায়। বিদেশি অন্যান্য কুঠিয়ালরা ক্ষতির মুখে পড়ে। একচেটিয়া হয়ে উঠে ইংরেজ কোম্পানী।

ঢাকার ইংরেজ বণিকরা কুঠি স্থাপন করেন ১৬৬৬ খ্রীস্টাব্দে। ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্কের পশ্চিমে কুঠি স্থাপিত হয়। কুঠির অধ্যক্ষ ছিলেন মি. প্রাট। ১৬৭০ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে ইংরেজদের ব্যবসা সম্প্রসারিত হতে থাকে।

১৬৬৮ খ্রীস্টাব্দে ফরাসিরা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বঙ্গদেশে আসে। প্রথমত তারা দেশীয় দালালদের মধ্যস্থতায় ব্যবসার কাজ সম্পন্ন করতেন। ১৭৪০/৪১ খ্রীস্টাব্দে নওয়াজিস মুহম্মদ খাঁ ঢাকার নায়েব নাজিম পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরে দুইজন ফরাসি এজেন্ট ঢাকায় বাণিজ্যকুঠি স্থাপনের অনুমতি পান। তারা ঢাকার তেজগাঁওয়ে একটি ‘গঞ্জ’ বা বাজার কিনে সেটার নাম দেন ‘ফরাসগঞ্জ’।

১৭৭৮ খ্রীস্টাব্দে ইংরেজরা পণ্ডিচেরী অধিকার করে ফরাসি কোম্পানী নিজেদের অধিকারে নিয়ে নেন। ১৭৮৩ খ্রীস্টাব্দে সন্ধি শর্তে কোম্পানী ফেরত পেয়েছিলেন ফরাসিরা, কিন্তু  ১৮০৩ খ্রীস্টাব্দে আবার অধিগ্রহণ করে ১৮১৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত নিজেদের অধিকারে রাখেন। অন্য উপায় না পেয়ে ফরাসিরা ১৮৩০ খ্রীস্টাব্দে ফরাসগঞ্জ বাজার বিক্রয় করে।

১৬৬৬ খ্রীস্টাব্দের আগেই বাবু বাজারে বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করেছিলেন ওলন্দাজরা। ১৬৭২ খ্রীস্টাব্দে সুবাদারদের আদেশক্রমে তাদের অবাধ বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হয়। ১৭৪২ খ্রীস্টাব্দের আগেই ওলন্দাজরা ঢাকার কুঠি বন্ধ করে দেন। ১৭৫৩ খ্রীস্টাব্দে তারা আবারও ঢাকায় বাণিজ্য করতে শুরু করেন। কিন্তু ১৭৮১ খ্রীস্টাব্দে ওলন্দাজদের কুঠি ইংরেজরা নিজেদের দখলে নেন। এরপর তারা সেখান থেকে ব্যবসা পরিচালনা করতেন। পরবর্তীতে ইংরেজরা ওলন্দাজদের ব্যবসা নিজেদের দখলে নেন। চলবে...

নিউজওয়ান২৪.কম/আ.রাফি