রহস্য উন্মোচনে প্রাচীনতম মমির সিটিস্ক্যান
বিজ্ঞান ডেস্ক
নিউজওয়ান২৪.কম
প্রকাশিত : ০৩:০০ পিএম, ২৯ ডিসেম্বর ২০১৬ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৯:৪৭ এএম, ১ জানুয়ারি ২০১৭ রোববার
চিলির ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে অন্য গবেষকদের একটি চিনচোরা মমি দেখাচ্ছেন নৃতত্ত্ববিদ ভেরোনিকা -ছবি এএফপি
এযাবত পাওয়া পৃথিবীর প্রাচীনতম মমির ইতিহাস জানতে হয়তো আর বেশি অপেক্ষা করতে হবে না। চিলির বিজ্ঞানী-গবেষকরা ওইসব মমির ডিএনএ বিশ্লেষণ ও কম্পিউটারাইজড টমোগ্রাফি (জীবদেহের রোগ নির্ণয়ে বা ভেতরকার অবস্থা জানতে এক্স-রে ও আল্ট্রাসাউন্ডের ব্যবহারে ব্যাপকভিত্তিক পরীক্ষণ ব্যবস্থা) করে ৭ হাজার বছর আগের চিনচোরো গোষ্ঠীর জীবনাচার সম্পর্কে জানতে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছেন।
প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণ আমেরিকা উপকূলের আতাকামা মরুভূমি প্রান্তের বাসিন্দা ছিল চিনচোরো গোষ্ঠী। এলাকাটা ছিল আধুনিক চিলি ও পেরু মাঝখানে।
গবেষণায় পাওয়া তথ্যে জানা যায়, ১০৪০০ থেকে ৩৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দকালীন সময়জুড়ে চিনচোরোদের বসবাস ছিল ওই অঞ্চলে। মৎস ও পশু শিকারজীবী এই গোষ্ঠীটি মিশরীয়দের চেয়েও কমপক্ষে ২০০০ বছর আগে আয়ত্ব করেছিল মৃতদেহ মমি করার কৌশল।
আজ থেকে ৭ হাজার ৪০০ বছর আগে তাদের করা মমি আবিষ্কারের সূত্রে ধারণা করা হয়- মৃতদেহ মমি করার ক্ষেত্রে পৃথিবীর প্রথমদিককার বিজ্ঞজনরে মধ্যে ছিল চিনচোরা সভ্যতার মানুষ।
সম্প্রতি চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোর লস কন্ডেস ক্লিনিকে ১৫টি চিনচোরো মমির মিটি স্ক্যান করা হয়েছে। এই মমিগুলোর বেশরিভাগই শিশু ও গর্ভস্থ শিশুর।
গবেষক দলের প্রধান রেডিওলজিস্ট মার্সেলো গালভেজ জানান, মমিদেহগুলোর এক মিলিমিটারের ও কম স্থান অন্তর অন্তর হাজার হাজার ছবি নেওয়া হয়েছে।
মৃত্যুর কারণ ও প্রাচীন ওই সভ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত করে আরও তথ্য জানতে মমিগুলো পরীক্ষার পরবর্তী ধাপ হবে- স্পর্শ না করেই এদের ব্যবচ্ছেদ করা। এটা হবে থ্রিডি ছবির মাধ্যমে করা মমিগুলোর সিম্যুলেশনের বায়বীয় ব্যবচ্ছেদ।
মার্সেলো গালভেজ বলেন, এই কায়দার ফলে মমিগুলোকে পরবর্তী আরও ৫ লাখ বছর সংরক্ষিত অবস্থায় রাখা যাবে।
হাই-টেক কম্পিউটার প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞদল মমিগুলোর পেশী ও মুখাবয়ব পুনস্থাপনের কাজ করে যাচ্ছেন এখন।
হাজার হাজার বছর আগে মারা যাওয়া ওই লোকগুলো কেমন ছিল দেখতে তাদের অবয়ব পুনর্গঠন করে তাদের জীবনকালের অবস্থা দেখতে চাইছেন গবেষকরা।
ধারণা করা হচ্ছে, মানবদেহের গঠনতত্ত্ব তথা শরীর-বিদ্যা সম্পর্কে জটিল কোনো তত্ত্ব জানা ছিল সুপ্রাচীন চিনচোরো গোষ্ঠীর। সম্ভবত তারা মৃতদেহের চামড়া (ত্বক) ও পেশী খুব সূক্ষ্ণভাবে আলাদা করার কৌশল জানতো।
১৯০৩ সাল থেকে নিয়ে এখন পর্যন্ত সময়ে ১৮০টি চিনচোরো মমি আবিষ্কার হয়েছে। এর সবগুলোই পাওয়া গেছে উন্মুক্ত স্থানে, সৈকত এলাকার কাছাকাছি। এ থেকে ধারণা করা যাচ্ছে, চিনচোরোরা তাদের মমি রাখার জন্য কোনো ধরনের পিরামিড বা ঘর-ইমারত নির্মাণ করতো না।
চিলির ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ন্যাচারাল হিস্টরির নৃতত্ত্ব বিভাগের প্রধান ভেরোনিকা সিলভা বলেন, কৃত্রিমভাবে তৈরি বিশ্বের প্রাচীনতম মমিগুলোর মালিকদের বিষয়ে জানতে চেষ্টা করছি আমরা।
তিনি বলেন, মমিকরণ প্রক্রিয়াটা চিনচোরোরা করতো পারিবারিকভাবে। অর্থাৎ মৃতের স্বজনরাই মমি তৈরির কাজ করতো।
তারা তাদের মৃতদের মরীর থেকে প্রথমে এর চামড়া ও মাংস আলাদা করে নিত। এরপর কঙ্কালের ওপর কাঠ, চারাগাছ ও কাদা দিয়ে দেহের অবয়ব তৈরি করতো। এরপর ওই শরীর কাঠামোর ওপর আগে থেকে খুলে রাখা চামড়াটা সেলাই করে আটকে দিত। চোখ ও চুল স্থাপনের পর একটি মুখাবয়ব স্থাপন করতো। সবশেষে মুখমণ্ডলের ওপর একটা মুখোশ জুড়ে দিত তারা।
এর ফলে কঙ্কালের ওপর মূল ত্বক দিয়ে পুনর্নির্মাণ করা কাঠামোট হতো একটি মূর্তি আর জ্যান্ত মানুষের মাঝামাঝি অদ্ভূত কিছু একটা যা হাজা হাজার বছর পরেও প্রায় অবিকল আছে।
চিনচোরোদের প্রথমদিককার মমিগুলো ছিল নবজাতক ও অজাত শিশুদের।
একই মৌলিক কায়দায় তৈরি করা হতো মমিগুলো- তবে প্রত্যেকটাই ছিল একটির থেকে অন্যটি আলাদা- সৃষ্টিশীলতা আর শৈল্পিক বিচারে। সময়ের ধারাবাহিকতায় তাদের মমিকরণ কাজের উন্নতি ছিল লক্ষণীয়।
সিলভা বলেন, মিশরীয়রা মমি তৈরি শুরুরও ২ হাজার বছর আগে থেকেই চিনচোরোরা মমি তৈরি করতে জানতো।
গবেষকরা মমিগুলোর চামড়া ও চুলের নমুনা পর্যবেক্ষণ করছেন জেনেটিক বিশ্লেষণের জন্য। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে এখনকার মানুষদের সঙ্গে তাদের জিনগত সম্পর্ক খুঁজে বের করা।
সিলভার ধারণা, চিলির মানুষজন এখনও সেই সুপ্রাচীন চিনচোরোদের জিন ধারণ করছে তাদের দেহকোষে।
গর্বিত ভঙ্গিতে তিনি বলেন, তাদের জীবনযাপন পদ্ধতি সম্পর্কে আমরা বিশদ জানতে চাই। জানতে চাই তাদের খাদ্যাভ্যাস- এমনকি আমরা চিলিয়ানরা এখনো তাদের জিন বহন করছি কি না! এএফপি, নিউজ.কম.এইউ, ইউটিউব
নিউজওয়ান২৪.কম/একে
