NewsOne24

আ.লীগ পেল ‘গতিশীল’ সাধারণ সম্পাদক

স্টাফ রিপোর্টার

নিউজওয়ান২৪.কম

প্রকাশিত : ০৮:১৩ পিএম, ২৩ অক্টোবর ২০১৬ রোববার | আপডেট: ০২:০৭ পিএম, ২৫ অক্টোবর ২০১৬ মঙ্গলবার

ঢাকা: সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে এবার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বেছে নিয়েছে দেশের স্বাধীনতায় নেতৃত্বদানকারী ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগ। তিনি স্থলভিষিক্ত হচ্ছেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের পদে। বহুল আলোচিত এই সম্মেলন শুরুর কয়েকদিন আগে থেকে যে গুঞ্জন ভাসছিল রাজনৈতিক আবহে- তা শেষতক সত্যে পরিণত হয়েছে।

অষ্টমবারে মতো দলের নির্বাচিত সভাপতি প্র্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা সিকি শতাব্দী পর বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ দেশের কাতারে নিয়ে যাওয়ার যে স্বপ্ন ধরে পথ চলছেন, তা পূরণে এবার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পেলেন ওবায়দুল কাদেরকে।

বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ হয়েছেন সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য। ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থা পরবর্তী ‘দুঃসময়ে’ দলকে রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা আশরাফ ২০০৯ সালে দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

আজ (রোববার) ক্ষমতাসীন দলটির কাউন্সিল অধিবেশনের শেষ দিনে শেখ হাসিনা সভাপতি পদে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর সাধারণ সম্পাদক পদেও নির্বাচন হয়। শীর্ষ দুটি পদে আর কোনো নাম প্রস্তাব না আসায় কাউন্সিলের জন‌্য গঠিত আওয়ামী লীগের নির্বাচন কমিশনের প্রধান ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন দুজনকে উল্লেখিত দুটি পদে নির্বাচিত ঘোষণা করেন।

রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা বর্তমান কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করার পরপরই নির্বাচনী অধিবেশন শুরু হয়। প্রসঙ্গত, দলের জন্য নয়া নেতৃত্ব বেছে নিতে শেখ হাসিনা গত কিছুদিন ধরেই আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। তবেক নির্বাচনী অধিবেশনের শুরুতেই ‘শেখের বেটি’র নামই সভাপতি পদের জন‌্য প্রস্তাব করা হয়। দলের বিদায়ী সভাপতিমণ্ডলীর সদস‌্য, প্রবীণ নেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর প্রস্তাবে সমর্থন করেন সভাপত্ণ্ডিলীর অপর সদস‌্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।

একইভাবে বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও নয়া সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ওবায়দুল কাদেরের নাম প্রস্তাব করেন যা সমর্থন করেন বিদায়ী যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, এমপি। নিজে থেকেই নিজের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিটির নাম এজন‌্য প্রস্তাব করায় কাউন্সিলে সৈয়দ আশরাফকে ধন‌্যবাদও জানান সভাপতি শেখ হাসিনা।

২০তম কাউন্সিলে এরপর সভাপতিমণ্ডলী গঠন করা হয়। বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ গুরুত্বপূর্ণ এই পরিষদে স্থান পেয়েছেন। সভাপতিমণ্ডলীতে তার পাশাপাশি নতুন এসেছেন নুরুল ইসলাম নাহিদ, আব্দুর রাজ্জাক, ফারুক খান, আবদুল মান্নান খান, রমেশ চন্দ্র সেন ও পীযূষ ভট্টাচার্য। নতুনদের পাশাপাশি পুরনোদের মধ‌্যে সভাপতিমণ্ডলীতে থাকছেন সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, কাজী জাফর উল‌্যাহ, সাহারা খাতুন, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।

আগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম হানিফ, দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবির নানকের সঙ্গে নতুন যোগ হয়েছেন আব্দুর রহমান। নয়া কমিটিতে কোষাধ‌্যক্ষ পদে এন এইচ আশিকুর রহমানই থাকছেন।

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে আশরাফের ওপর ভরসা রেখে তাকে মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ পদে এনেছিলেন শেখ হাসিনা।

দলের নেতা-কর্মীরা আশরাফকে সহজে পান না বলে অভিযোগের মধ‌্যেও হেফাজতী তাণ্ডব ও বিএনপির পেট্রল বোমা-আন্দোলন পেরিয়ে নির্বাচন করার দক্ষতায় তার ওপরই ভরসা রেখে যান বঙ্গবন্ধুকন‌্যা। অবশ্য গত বছর হঠাৎ করেই সৈয়দ আশরাফকে দপ্তরছাড়া করার পর পরিস্থিতি কিছুটা গোলমেলে হয়ে ওঠে। অনেকই সেই সুযোগে পানি ঘোলা করার চেষ্টাও করে। তবে সপ্তাহের ব‌্যবধানেই পরিস্থিতি সুচারভাবে সামলে নেন প্রধানমন্ত্রী- আশরাফকে জনপ্রশাসনমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেন।

এবার কাউন্সিলের কয়েকদিন আগে থেকে গুঞ্জন ছড়ায় যে সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তন আসছে। সভাপতিমণ্ডলীর সদস‌্য ওবায়দুল কাদেরও তার ঘনিষ্ঠজনদের জানিয়েছিলেন, নেত্রী তাকে ‘তৈরি’ থাকতে বলেছেন। আর আশরাফ সাংবাদিকদের বলেন, নেতৃত্বে কে আসবে, তা শুধু শেখ হাসিনা ও তিনিই জানেন। কাউন্সিলে তিনিই নতুন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নাম প্রস্তাব করেন।

সড়ক পরিবহনমন্ত্রী হিসেবে দেশজুড়ে সড়কপরিবহনের হাল-হকিকত দেখতে সশরীরে ছুটোছুটি করে আলোচিত ওবায়দুল কাদেরকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পাওয়ায় আওয়ামী লীগ আরও শক্তিশালী হবে বলে সন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

অপরদিকে, এবারই প্রথম আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর হিসেবে সম্মেলনে যোগ দেওয়া প্রধানমন্ত্রীপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে নেতৃত্বে আসতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের দাবিতে সায় দেননি যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী জয়। বিনয়ে সঙ্গে তিনি জানান, প্রবাসে থেকে দলীয় পদ রাখতে চান না তিনি।

‘আশরাফুল আমার ছোট ভাইয়ের মতো’
শেখ হাসিনা কাউন্সিলে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, আশরাফুলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই, ও আমার ছোট ভাইয়ের মতো। শহীদ পরিবারের সন্তান হিসেবে সে সংগঠন ও দেশকে ভালবেসেছে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে ওবায়দুল কাদেরের নাম প্রস্তাব করেছে, ধন্যবাদ জানাই। আশা করি সংগঠন আরও শক্তিশালী হবে।

সম্মেলনস্থল থেকে বের হয়ে গাড়িতে ওঠার সময় সৈয়দ আশরাফকে জড়িয়ে ধরেন শেখ হাসিনা। আবেগাপ্লুত আশারাফও এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে ধরেন।

প্রসঙ্গত, এবার কাউন্সিলের কিছু দিন আগে দলের থেকে দায়িত্ব ছাড়ার ইচ্ছার কথা জানিয়ে আসছিলেন ৭০ বছরে পা দেওয়া দেশের প্রধান নির্বাহী শেখ হাসিনা। কাউন্সিলেও কয়েকবারই নতুন নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার কথা বলেন টানা ৩৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিয়ে আসা বঙ্গবন্ধুকন‌্যা।

তবে যতবারই তিনি কাউন্সিলে দায়িত্ব ছাড়ার কথা বলেছেন, ততবারই কাউন্সিলর ও নেতারা ‘না না’ বলে দ্বিমত প্রকাশ করেন। প্রসঙ্গত, গত শতাব্দীতে এরশাদ পতনের পর ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে হারের পর দলীয় প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন শেখ হাসিনা। সেবার (৩ মার্চ ১৯৯১) ৩২ নম্বর সড়কে থেকে নিয়ে মিরপুর রোডে নেতাতর্মীরা রাস্তায় শুয়ে পড়ে তার ওই সিদ্ধোন্তে দ্বিমত জানান এবং তাকে স্বপদে থেকে যেতে অনুপ্রাণিত করেন। তিনি পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে নেন।

বিভিন্ন সময়ে ওবায়দুল কাদের
পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত‌্যাকাণ্ডে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চরম বিরূপ সময়ে ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন ওবায়দুল কাদের। ওই সময় আড়াই বছর তিনি কারান্তরীণ ছিলেন। কারাগারে থাকা অবস্থায়ই বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন, দায়িত্ব পালন করেন পরপর দুই মেয়াদ। ডাকসুতে সংগঠনের হয়ে ভিপি প্রার্থীও হয়েছিলেন। করেছেন র্সাবাদিকতাও- ছাত্রজীবন শেষে দৈনিক বাংলার বাণীতে কাজ করতেন।

ছাত্রজীবনে মেধাবী কাদের উচ্চ মাদ্যমিকে মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন।

১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা ছিল তার। ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানেও সক্রিয় ছিলেন এবং মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নেন। তিনি মুজিব বাহিনীর কোম্পানীগঞ্জ থানা কমান্ডার ছিলেন।

নোয়াখালীর সন্তান ওবায়দুল কাদের ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সভায় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত হন। নোয়াখালী-৫ আসন থেকে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার স্ত্রী ইসরাতুন্নেসা পেশায় আইনজীবী।

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারের যুব, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এবারের কাউন্সিলে ৬৪ বছর বয়সী ওবায়দুল কাদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার পা ছুঁয়ে শ্রদ্ধাবনত হন। এরপরই তিনি জড়িয়ে ধরেন সাবকে হতে চলা সম্পাদক সৈয়দ আশরাফকে। আশরাফের সঙ্গে আলিঙ্গন শেষ করে সাহারা খাতুনেরও পা ছুঁয়ে সালাম করেন তিনি।

গত কাউন্সিলে সভাপতিমণ্ডলীতে আসার আগে ওবায়দুল কাদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদেও ছিলেন। ২০০৮ সালে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে গ্রেপ্তার থাকাকালে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নিয়ে সমালোচিত ওবায়দুল কাদের।

নিউজওয়ান২৪.কম/একে