NewsOne24

ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন?

বিশ্ব সংবাদ ডেস্ক

নিউজওয়ান২৪

প্রকাশিত : ১১:০৫ এএম, ২৯ অক্টোবর ২০২৬ বৃহস্পতিবার

ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকট। ছবি: অন্তর্জাল

ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকট। ছবি: অন্তর্জাল


ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ৩ দশকের বেশি সময় ধরে দেশটির রাজনীতিতে সক্রিয়। এই সময়ে বহুবার তার রাজনৈতিক বিদায়ের আশঙ্কা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি ক্ষমতায় ফিরেছেন বা নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। তবে এবারের নির্বাচনের ফল তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।

অধিকাংশ ভোট গণনা শেষে ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা স্পষ্ট হয়নি। ফলে নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকবেন কি না, তা নিয়ে আগামী কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস ধরে রাজনৈতিক দরকষাকষি চলতে পারে।

১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি আনুমানিক ২৬টি আসন নিয়ে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে রয়েছে। কিন্তু তার নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি জোটের আসনসংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৫৩টিতে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের চেয়ে যা ৮টি কম।

অর্থাৎ, নেতানিয়াহু এখনো জয়ী হননি, আবার পরাজিতও হননি। তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা যাতে বিকল্প সরকার গঠন করতে না পারেন, এখন সেই চেষ্টা চালাতে হবে তাকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এভাবেই আবারও ক্ষমতায় টিকে যেতে পারেন তিনি।

সরকার গঠনে আরব দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ

নির্বাচনের হিসাবে বিরোধী দলগুলোর সম্মিলিত আসনসংখ্যা প্রায় ৬৭। কিন্তু আদর্শগত, জাতীয় ও ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে এই শিবিরে ঐক্য ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি পেয়েছে ২১টি আসন। তবে আরব দলগুলো বাদ দিলে ইহুদিবিরোধী দলগুলোর সম্মিলিত আসনসংখ্যা ৪৮। সরকার গঠনের জন্য তাদের আরব নেতৃত্বাধীন রা’আম ও জয়েন্ট লিস্ট পার্টির সমর্থন প্রয়োজন হবে। দল দুটি মিলিয়ে রেকর্ড ১৯টি আসন পেতে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের আরব বা ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের মধ্যে এবার রেকর্ডসংখ্যক ভোটার অংশ নিয়েছেন।

রা’আম একটি ইসলামপন্থি দল, যার সমর্থকদের বড় অংশ ইসরায়েলের বেদুইন সম্প্রদায়ের। দলটির নেতা মনসুর আব্বাস ২০২১ সালের নির্বাচনের পর প্রথম আরব রাজনীতিক হিসেবে ইসরায়েলের সরকারে যোগ দিয়েছিলেন।

অন্যদিকে, জয়েন্ট লিস্ট কয়েকটি ছোট দলের সমন্বয়ে গঠিত। এর মধ্যে রয়েছে কমিউনিস্টপন্থি হাদাশ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী তাল এবং জাতীয়তাবাদী বালাদ।

বুধবার বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান বিরোধী জোটের অংশ হিসেবে আরব দলগুলোকে বিবেচনার আহ্বান জানান। তিনি নেতানিয়াহুর ‘ইহুদি ও আরব ভোটের মধ্যে বর্ণবাদী বিভাজন’ তৈরির প্রচেষ্টার সমালোচনা করেন।

তবে আইজেনকোটের ডানপন্থি ২ মিত্র নাফতালি বেনেট ও আভিগদর লিবারম্যান আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল কোনো সরকার গঠনের বিরোধিতা করেছেন। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর এ বিষয়ে তারা নতুন করে কোনো বিবৃতি দেননি।

জয়েন্ট লিস্ট বুধবার জানিয়েছে, তারা রাজনৈতিক সহযোগিতায় প্রস্তুত এবং নেতানিয়াহুর শাসনের অবসান ঘটাতে নিজেদের সামর্থ্যের সবটুকু ব্যবহার করতে রাজি।

কী করতে পারেন নেতানিয়াহু?

নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, নির্বাচনের পর তার প্রধান লক্ষ্য হলো ইহুদি ও আরব দলগুলোর রাজনৈতিক সহযোগিতার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং এ ধরনের জোট গঠন ঠেকানো।

সূত্রটির ভাষ্য, সংখ্যালঘু সরকারের সম্ভাবনা নিয়ে নেতানিয়াহু খুবই উদ্বিগ্ন। আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা না করতে বিরোধী শিবিরের পৃথক আইনপ্রণেতাদের ওপরও চাপ দিতে পারেন তিনি।

নির্বাচনী প্রচারে আরব দলগুলোর বিরোধিতা করার পর বুধবার লিকুদ পার্টি অভিযোগ করে, ঘুস, হুমকি, সহিংসতা ও জালিয়াতির মাধ্যমে আরব দলগুলো নির্বাচন ‘চুরি’ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনি জালিয়াতির অভিযোগের সঙ্গে এই বক্তব্যের মিল রয়েছে। ট্রাম্প নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ মিত্র।

কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, তারা অভিযোগটি খতিয়ে দেখছে। তবে নির্বাচনের দিন বিভিন্ন দলের করা হাজারো অভিযোগ কমিশন এরই মধ্যে খারিজ করেছে।

নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ ওই সূত্রের দাবি, সম্ভাব্য বিকল্প সরকার গঠনের পথ বন্ধ করতে নেতানিয়াহু ‘সব ধরনের উপায়’ ব্যবহার করতে পারেন। এর মধ্যে ইরানে হামলা চালানো কিংবা ট্রাম্পকে ইসরায়েলের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে উৎসাহিত করার বিষয়টিও থাকতে পারে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

বিরোধী শিবিরের আশঙ্কা, নেতানিয়াহু কোনো নিরাপত্তা সংকটকে কাজে লাগিয়ে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া বিলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত করতে পারেন।

নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ইরানে যৌথ হামলা চালানোর জন্য চাপ দিয়েছিলেন। তবে ইসরায়েলের সেনাপ্রধান আইয়াল জামির সতর্ক করেছিলেন, এমন হামলা নির্বাচনে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। আংশিকভাবে এ কারণেই ওয়াশিংটন তখন হামলা থেকে বিরত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসরায়েলের এক নিরাপত্তা সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা প্রস্তুত রয়েছে এবং ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষায়। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এ অনুমোদন আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিরোধী শিবিরের এক সূত্র বলেছে, নেতানিয়াহু কী করবেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে তিনি নতুন করে উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন বলে তারা আশঙ্কা করছেন। আরেকটি সূত্রের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে না চাইলে নেতানিয়াহু দেশের ভেতরে ও বাইরে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করতে পারেন।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক প্রধান আইজেনকোট মঙ্গলবার রাতে নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, নেতানিয়াহু এখন তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী; তার নতুন কোনো ম্যান্ডেট নেই এবং জনগণের আস্থাও নেই। বুথফেরত জরিপ প্রকাশের পর সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে।

ফল প্রকাশের পর আইজেনকোট আবারও ইসরায়েলে পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি দেন।

এরপর কী হবে?

এরই মধ্যে অধিকাংশ ভোট গণনা শেষ। এখন সেনাসদস্য, কারাবন্দি, হাসপাতালে থাকা রোগী ও কর্মী, বিদেশে কর্মরত কূটনীতিক এবং প্রতিবন্ধী ভোটারদের বিশেষ ব্যালট গণনা করা হবে।

কমিশনের হিসাবে, এ ধরনের ‘ডাবল এনভেলপ’ ব্যালটের সংখ্যা ৪ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৪ লাখ ৮০ হাজারের মধ্যে। এসব ভোটে ১০টিরও বেশি আসনের হিসাব বদলে যেতে পারে।

এরপর শুরু হবে সরকার গঠনের রাজনৈতিক আলোচনা।

এ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। নির্বাচনের পর তিনি সব নির্বাচিত দলের সঙ্গে আলোচনা করে জানতে চাইবেন, তারা কাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন করে। এরপর যিনি ৬১ আসনের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনে সবচেয়ে বেশি সক্ষম বলে মনে হবে, তাকেই দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দলের নেতাকেই যে দায়িত্ব দেওয়া হবে, এমন নয়। বরং জোট গঠনের বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা যার বেশি, তাকেই বেছে নেওয়া হতে পারে।

আরব দলগুলো আইজেনকোটকে সমর্থন দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের কাছে তার পক্ষে বেশি সুপারিশ জমা পড়তে পারে।

সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রার্থী ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানো হতে পারে। এ সময়ে মন্ত্রিসভার পদ, বাজেট ও নীতিমালা নিয়ে অন্য দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে জোট গঠন করতে হবে।

তিনি ব্যর্থ হলে অন্য একজন প্রার্থীকে চার সপ্তাহের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হবে। দ্বিতীয় প্রার্থীও ব্যর্থ হলে নেসেটের সদস্যরা বিকল্প প্রার্থী সামনে আনার জন্য সীমিত সময় পাবেন। তাতেও সমাধান না হলে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

এখানে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহু কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন। আইজেনকোট প্রথমে সরকার গঠনের দায়িত্ব পেয়ে ব্যর্থ হলে নেতানিয়াহুকে শুধু সময় পার হওয়ার অপেক্ষা করতে হবে। নতুন নির্বাচন হলে সেই নির্বাচন পর্যন্তও তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।

বিরোধীদের সামনে বিকল্প পথ

সরকার গঠন করতে না পারলেও পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সম্ভাব্য সুবিধা কাজে লাগাতে পারে বিরোধী দলগুলো। তারা নেসেটের স্পিকারসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আনতে পারে। এতে নেতানিয়াহুর সরকার পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করা এবং কিছু আইন পাসের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে আইজেনকোটের জন্য চ্যালেঞ্জও রয়েছে। নেতানিয়াহুর জোটের সদস্যরা তার প্রতি অত্যন্ত অনুগত। ফলে তাদের মধ্যে ভাঙন ধরার আশঙ্কা কম। কিন্তু আইজেনকোটের জোটে আদর্শগত পার্থক্য বেশি। ছোট কোনো মতবিরোধও জোট ভেঙে দিতে পারে এবং দেশকে আবার নির্বাচনের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

এ অবস্থায় প্রেসিডেন্ট হারজগের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনো পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় তিনি নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের উদ্যোগ নিতে পারেন।

বুধবার হারজগ বলেন, ‘নতুন করে আরেকটি নির্বাচন এড়াতে আমাদের সবকিছু করতে হবে।’ এ জন্য তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের আলোচনায় ‘খোলা মন’ নিয়ে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

সূত্র: সিএনএন

নিউজওয়ান২৪.কম/গাজী Newsone24.com/Gazi