ঢাকা, ১৬ নভেম্বর, ২০১৮
NewsOne24
সর্বশেষ:
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে একজনের মৃত্যু, দগ্ধ ৩ শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি রুটে নৌযান চলাচল বন্ধ

‘অভিশপ্ত হীরক’

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১:৪৭, ১১ অক্টোবর ২০১৮  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

হাজারো নারীর আকাঙ্খা, বিধ্বংসী সাম্রাজ্যের উপাখ্যান, লুটতরাজ, রহস্যময় মৃত্যু ও আত্মহননের নীরব সাক্ষী হয়ে অদ্যপি দুনিয়ায় হাতবদল হয়ে চলেছে কিংবদন্তীতূল্য হীরকরাজি। 

আজ এসেছি ইতিহাস গড়া এক হীরক খণ্ড নিয়ে। যার কুখ্যাতি রয়েছে অভিশপ্ত পাথর বলে। তার নাম `দ্য ব্ল্যাক অরলভ’।

‘দ্য ব্ল্যাক অরলভ’ মানব মনে কালো রঙ এর দৃষ্টি বিভ্রম সৃষ্টি করলেও কিংবদন্তির এই হীরাটির সম্মোহিত রূপ প্রকৃতিগতভাবে খানিকটা ভিন্ন। অনেকটা গান মেটাল কালারের এই হীরার প্রাপ্তির অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে অন্ধকারতম ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি। 

কথিত রয়েছে দ্য ব্ল্যাক অর্লভ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এক দৈব মূর্তিতে প্রতিস্থাপিত ছিলো। কমপক্ষে তিনটি রহস্যজনক আত্মহননের ঘটনার সঙ্গে দ্য ব্ল্যাক অরলভের সম্পর্ক রয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

দ্য ব্ল্যাক অরলভ একটি খোঁজ পাওয়া যায় সনাতন ধর্মে। সনাতন ধর্মানুসারে সকল সৃষ্টির পিতা দেবতা ব্রহ্মা’র চক্ষু বলা হয় দ্য ব্ল্যাক অরলভকে। ৬৭ দশমিক ৫০ ক্যারট ওজনের হীরাটি একদা ১৯৫ ক্যারট ওজন সম্পন্ন অখনণ্ড প্রাকৃতিক হীরার অংশবিশেষ ছিলো। সম্পূর্ণ হীরাটি উনিশ শতকে ভারতবর্ষে খুঁজে পাওয়া যায়। কিংবদন্তি রয়েছে অখনণ্ড হীরাটি ব্রহ্মা দেবের চক্ষু হিসেবে মূর্তিতে প্রতিষ্ঠিত ছিলো। সৃষ্টির দেবতা হিসেবে মান্য ব্রহ্মা দেবের মূর্তিটি দক্ষিণ ভারতের পন্ডিচেরি শহরের কোনো এক মন্দিরে রক্ষিত ছিলো। কথিত রয়েছে ভ্রমণরত কোনো ভিক্ষু ব্রহ্মার চোখরূপী হীরাটি খুলে নিয়ে পালিয়ে যায়। তখন হতেই ‘দ্য ব্ল্যাক অরলভ’ অভিশপ্ত।

যদিও, দ্য ব্ল্যাক অরলভের সঙ্গে এই ধরণের অভিশাপের অস্তিত্ব সম্পর্কে অনেকেই সন্দীহান এবং এই হীরক খনণ্ডটির প্রাপ্তি ভারতবর্ষে প্রচলিত লোককথা বলেই অনেকে ভেবে থাকেন। তবু কোথাও খানিকটা কিন্তু রয়েই যায়। দ্য ব্ল্যাক অরলভের যাত্রা পারতপক্ষেই রহস্য, নাটকীয়তা ও মৃত্যুর মিছিলের এক আকর্ষণীয় গাঁথা।

১৯৩২ সালে দ্য ব্ল্যাক অরলভ ইউরোপীয় হীরক ব্যবসায়ী জেডব্লিউ প্যারিসের হাত হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসার পথ খুঁজে পায়। প্যারিস তখন অভিশপ্ত হীরাটি বিক্রির জন্য উপযুক্ত ক্রেতার সন্ধান করছিলেন। প্যারিস নিউইয়র্কে পৌঁছানোর এক সপ্তাহের মধ্যে দ্য ব্ল্যাক অরলভ বিক্রি করে দেন। একই বছর ৭ সেপ্টেম্বর ফিফথ এভিনিউয়ের আকাশ ছোঁয়া ম্যানহাটন বিল্ডিংয়ের শীর্ষ তলা হতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। জনাব জেডব্লিউ প্যারিসের আত্মহত্যাকে দ্য ব্ল্যাক অরলভের উপর বিদ্যমান অভিশাপ সৃষ্ট মৃত্যুর সূচনা বলে ধারণা করা হয়।

কথিত রয়েছে জেডব্লিউ প্যারিস ব্যবসায়িক কারণে চরম উদ্বেগে ভুগছিলেন এবং তার মৃত্যু পরবর্তী দুইটি চিঠির খোঁজ পাওয়া যায়। যার একটি তার স্ত্রীকে এবং অন্যটি সহকর্মী জুয়েলারীকে ব্যবসায়ীকে সম্বোধন করে লেখা কিন্তু চিঠি দুইটির বিষয়বস্তু সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এবার বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ফিরে যাবার পালা। দ্য ব্ল্যাক অরলভ হীরাটি উত্তরাধিকার সূত্রে রাশিয়ান প্রিন্সেস নাদিয়া ভিজিন-অরলভ এর দখলে ছিল। কিংবদন্তির কালো হীরার নামকরণ তার নামানুসারে করা হয় বলে তথ্য পাওয়া যায়।

১৯১৭ সালে রাশিয়ান বিপ্লবের সময় রাজকুমারী নাদিয়া নিরাপত্তার স্বার্থে রাশিয়া থেকে ইতালি পালিয়ে যান যেমনটি রাশিয়ার অনেক রাজ পরিবার সে সময় করেছিলেন। এর কয়েক বছর পরে হীরক ব্যবসায়ী জনাব জেডব্লিউ প্যারিসের আত্মহননের ঠিক ১৫ বছর পর ১৯৪৭ সালের ২ ডিসেম্বর রাজকুমারী নাদিয়া সেন্ট্রাল রোমের একটি সুউচ্চ ভবন থেকে ঝাঁপ দেন। মৃত্যুর সময় রাজকুমারী নাদিয়া এক রাশিয়ান জুয়েলারের স্ত্রী ছিলেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পরিস্থিতি বা কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট কোন ধারণা পাওয়া যায়নি। তবে কি এই মৃত্যুর পেছনেও লুকোনো ছিলো দ্য ব্ল্যাক অরলভের অভিশপ্ত কালো হাত! তা আজো অজ্ঞাত।

রাজকুমারী নাদিয়ার মৃত্যুর ঠিক এক মাস পূর্বে রাশিয়ান রাজতন্ত্রের অন্য এক সদস্য রাজকুমারী লিওনিলা ভিক্টোরোভানা-বারিয়াতিনস্কি মৃত্যু মুখে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। সেটিও আত্মহত্যার ঘটনা। তার মৃত্যুর সময়, রাজকুমারী লিওনিলা রয়্যাল নেভি অফিসার প্রিন্স আন্দ্রে গ্লিনস্টাইনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। রাজকুমারী লিওনিলার মারাত্মক লাফের মধ্য দিয়ে আত্মহননের পেছনের কারণ ও তার জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত তেমন কিছু জানতে পারা যায়নি, যদিও পরবর্তীতে আবিষ্কার করা হয়েছিল যে মৃত্যুর পূর্বে তিনি অভিশপ্ত মূল্যবান পাথর দ্য ব্ল্যাক অরলভের মালিক ছিলেন।

দ্য ব্ল্যাক অরলভের পাশাপাশি, দ্বিতীয় আরেক অভিশপ্ত হীরার আবেশ অর্লভ পরিবারকে তাড়া করছিল, যা হোয়াইট অরলভ ডায়মন্ড নামে পরিচিত ছিল। হোয়াইট অর্লভ ১৮০ দশমিক ৬০ ক্যারট ওজন বিশিষ্ট সাদা হীরা ছিল, যা ক্যাথরিন দ্য গ্রেটকে তার গোপন প্রেমিক কাউন্ট গ্রেগরি গ্রিগোভিয়েচ অর্লভ উপহার দেন।

সে সময় কাউন্ট গ্রেগরি গ্র্যান্ড ডাচেস ক্যাথারিনের প্রেমে সম্পূর্ণরূপে অন্ধ ছিলেন এবং হোয়াইট অরলভ নামক হীরাটি তার অন্ধ ভালোবাসার প্রতীক হিসাবে উপহার দেন। কাউন্ট গ্রেগরি প্রিয়া ক্যাথারিনকে তার স্বামী সম্রাট পিটারের কবল থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। গ্র্যান্ড ডাচেস ক্যাথারিন কাউন্টের দেয়া হীরাটি উপহাররূপে গ্রহণ করার পর, কাউন্ট গ্রেগরি সম্রাট তৃতীয় পিটারকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। লক্ষ্য ছিলো ক্যাথরিনকে রাশিয়ার সম্রাজ্ঞীর পদে অভিযুক্ত করা।

পরবর্তীতে সম্রাজ্ঞী ক্যাথারিন রাশিয়ার দীর্ঘতম ক্ষমতাসীন নারী হিসেবে সিংহাসন ও নেতৃত্বে বহাল ছিলেন।

কিন্তু ক্যাথারিন সিংহাসনে বসার পরবর্তী সময় কাউন্ট গ্রেগরির জন্য মোটেও সুখকর ছিলো না। কাউন্টের সঙ্গে ক্যাথারিন সম্পর্ক গড়তে অস্বীকৃতি জানান তিনি। গ্রেগরি রাশিয়া ত্যাগ করে সাময়িক সময়ের জন্য লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান। কিন্তু ক্যাথারিনের প্রতি অন্ধ ভালোবাসা তাকে কোনো স্থানেই এক বিন্দু শান্তি দেয়নি। তিনি কিছুতেই তার ভালোবাসা ভুলতে পারেননি। পরিশেষে ১৭৮১ সালে কাউন্ট গ্রেগরি পুনরায় রাশিয়াতে নিজ ভূমে ফিরে আসেন। ফিরে আসার কিছুদিনের মধ্যেই ব্যর্থ প্রেমের যাতনা সইতে না পেরে উন্মাদ হয়ে যান এবং পরের বছর মস্কোতে শেষনিঃশাস ত্যাগ করেন।

পরবর্তীতে দ্য ব্ল্যাক অরলভের মালিক, চার্লস এফ উইলসনের অনুরোধে, ১৯৫০-এর দশকে, অস্ট্রিয়ার এক জুয়েলারি দ্বারা হীরাটি পুনরায় কাটা হয়। হীরাটি কাটার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিলো অভিশাপ কাটানো। দ্য ব্ল্যাক অরলভকে পুরোপুরি কেটে নতুন আকার দিতে দুই বছর সময় পার হয়ে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দ্য ব্ল্যাক অরলভের অভিশাপ খণ্ডনে সাফল্য অর্জিত হয়।

এরপর থেকে দ্য ব্ল্যাক অরলভ বহু ব্যবসায়ীর হাত বদল হলেও কেউ অভিশাপের বশবর্তী হয়ে দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুবরণ করেছে এমন সংবাদ জানা যায়নি। ৬৭ দশমিক ৫০ ক্যারট ওজন বিশিষ্ট ব্ল্যাক অর্লভ বর্তমানে ১২৪-হীরা বিশিষ্ট নেকলেস এর মধ্য থেকে তুলে নিয়ে ১০৮ হীরার সমন্বয়ে সাজানো ব্রোচের মধ্যমণি হয়ে বসে আছে। জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ও চলচ্চিত্র ডেস্পারেট হাউস ওয়াইভস-এর অভিনেত্রী ফেলিসিটি হাফম্যান অস্কার অ্যাওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠানে দ্য ব্ল্যাক অর্লভ এর ব্রোচটি পরিধান করেন।

নিউজওয়ান২৪/আরএডব্লিউ