News One24 logo
Sena Kalyan Sangstha
bangla fonts
২৬ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪, সোমবার ১১ ডিসেম্বর ২০১৭, ৯:৪৫ পূর্বাহ্ণ
facebook twitter google plus rss
সর্বশেষ খবর
ক্ষমতা ধরে রাখতে সরকার বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছে : খালেদা জিয়া জেরুজালেমকে ইফিলিস্তিনে ব্যাপক সংঘর্ষ, ইহুদি সেনাদের গুলতে নিহত ২ শাকিব-অপুর বিয়ে বিচ্ছেদের কেন্দ্রে কি তাহলে বুবলি? পারিবারিক কলহের জেরে একসঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর বিষপান! প্রযুক্তির সুফলতা বাংলাদেশও পেতে চায়: জয়

ঝাড়-ফুঁকে সাপ কামড়ানো রোগী ‘ভালো হয় যেভাবে’


২৮ জুলাই ২০১৬ বৃহস্পতিবার, ১০:১০  এএম

ডা. রতীন্দ্র নাথ মন্ডল


ঝাড়-ফুঁকে সাপ কামড়ানো রোগী ‘ভালো হয় যেভাবে’

অনেকদিন পর আজ সাপ কামড়ানো রোগী দেখালাম। আমাদের রংপুর কমিউনিটি মেডকেল কলেজের আইসিইউতে অ্যাডমিশন হয়েছে। গতকাল রাতে রোগী মাছ ধরতে গিয়েছিল, সেখানে তাকে সাপ কামড়ায়।

এরপর যা সচরাচর হয়: রোগীকে নিয়ে ঝারফুক, পা দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাধা হয়। যখন রোগীর চোখে সমস্যা শুরু হয় (একটি জিনিস দুইটি দেখে) তখন হাস্পাতালে নিয়ে আসে। এতক্ষনে রোগীর আরও সমস্যা শুরু হয়, চোখের পাতা পড়ে যায় (ptosis), রোগী ঘাড় শক্ত করে রাখতে পারে না (broken neck sign) হয়। রোগী সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করার ঔষধ (polyvalent antisnake venom)দেয়া হয়। কিছুক্ষন পর রোগীর শাসকষ্ট শুরু হয়।

এরপর রোগীর O2 এর মাত্রা অনেক কমে যায়, রোগীকে কৃত্রিমভাবে শাস-প্রস্বাস দেবার ব্যাবস্থা করা হয়। আমি রোগীকে অনেক ভালো দেখলাম, রোগী অনেকটা response করছে। আরও এক ডোজ সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করার ঔষধ (polyvalent antisnake venom) দেয়ার ডিসিশন দেয়া হল এবং সাথে inj. Atropine and inj. Neostigmine.

আমি বিষাক্ত সাপদংশনের প্রায় ৫০ জনের মতো রোগীর চিকিৎসা করেছিলাম। আমার past experience থেকে মনে হয় রোগীটি ভালো হয়ে যাবে। সবাই রোগীর জন্য দোয়া করবেন।

সাপ কামড়ানোর ঘটনাগুলো সাধারনত এরকম-
১। রাতের বেলা মাঠে মাছ ধরতে গিয়ে সাপ কামড়ায়।
২। বরষার সময় চারিদিকে যখন পানি থাকে তখন সাপ শুকনো জায়গার জন্য বাসার ভিতরে আশ্রয় নেয়। সাধারনত খড়ি রাখার জায়গায়, বিছানায়, রান্না ঘরে, আলনায় সাপ আশ্রয় নেয়। এসব জায়গায় অন্ধকারে/শব্দহীনভাবে গেলে সাপ কামড়ানোর ঝুঁকি অনেক থাকে।
৩। রাতের বেলা অন্ধকার রাস্তায় চলার সময়। (কারণ, সাপ সাধারণত রাতের বেলা চলাচল বেশি করে)।
৪। মুরগী বা হাঁসের ঘরে।
৫। গরমের সময় বারান্দায় ঘুমানোর সময়।

সাপ দংশন থেকে প্রতিকার পেতে কি করা উচিত?

আমাদের দেশে সাপ দংশনের ঘটনাগুলো সাধারণত মে থেকে অক্টোবর মাসে হয়ে থাকে। কারণ, এই সময় বৃষ্টি হয়, চারিদিকে পানি হয়। সাপ সাধারণত পানিতে থাকতে চায় না। তাই শুকনো জায়গার জন্য বাসাবাড়িতে আসে। সেখানে কোনোভাবে মানুষের সাথে কন্ট্যাক্ট হলে, সাপ নিজেকে threatened মনে করলে তখন দংশন করে।

১। রাতের বেলা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মাঠে যাবেন না। গেলে অবশ্যই পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করে যাবেন। যাবার সময় বড় একটা লাঠি নিয়ে সাম্নের জায়গায় লাঠি দিয়ে শব্দ করে যাবেন। শব্দ শুনলে সাপ অবশ্যই চলে যাবে।
২। খড়ি আনতে যাবার সময় লাঠি দিয়ে আগে শব্দ করে তারপর খড়ি নিতে যাবেন।
৩। রাতে রাস্তায় চলাচলের জন্য টরচ লাইট অবশ্যই সংগে রাখুন।
৪। মুরগী বা হাসের ঘরে লাঠি দিয়ে শব্দ করে পরযাপ্ত আলোর ব্যবসহা করে যাবেন।
৫। গ্রামের বিছানায় শোবার আগে কোন কিছু দিয়ে শব্দ করুন, ভালো করে দেখে বিছানায় শোবেন।
৬। কোনভাবেই বারান্দায় বা বাইরে শোয়া যাবে না।
সাপ কামড়ালে কি করবেন?
১। আতংকিত হবেন না। কারণ, সাধারণত শতকরা ৯৬-৯৭ শতাংশ সর্পদংশন হয় অবিষাক্ত সাপ দ্বারা।
২। যে জায়গায় সাপ কামড় দিয়েছে সে জায়গাটা নাড়ানো যাবে না। ক্রেপ ব্যন্ডেজ দেয়া সবচেয়ে ভাল। তবে গ্রামে পাতলা গামছা বা শাড়ির কাটা অংশ দিয়ে লুজ করে বেধে দিতে হবে। বাধার উদ্দেশ্য হল, যেন lymphatic drainage হতে না পারে, আর রোগী ওই অংশটা নাড়াতে না পারে। (সাপের বিষ lymphatic দিয়ে শরীরে ছড়িয়ে যায়)।
৩। কোনোভাবেই রোগীকে ঝাড়-ফুঁক, কবিরাজী, সাপ কাটার জায়গা ব্লেড দিয়ে কেটে ফেলা- এসব করা যাবে না। কারণ, কোনোভাবেই সময় নষ্ট করা যাবে না। বিষাক্ত সাপ কামড়ালে যত তাড়াতাড়ি সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করার ঔষধ দেয়া যাবে রোগী ভালো হবার সম্ভবনা তত বেশি।
৪। রোগীকে দ্রুত কাছের হাসপাতালে নিয়ে যাবেন, যেখানে সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করার ঔষধ এবং কৃত্রিমভাবে শ্বাস-প্রস্বাস দেবার ব্যবস্থা আছে।
৫। অবশ্যই রোগীকে সাপ কামড়ানোর সময় থেকে ২৪ ঘণ্টা অবজার্‌ভ করে তারপর হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাবেন। কারণ, সাধারণত সাপ কামড়ানোর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিষক্রিয়া হয়। এই সময়ের মধ্যে বিষক্রিয়ার কোনো লক্ষণ না হলে আর ভয়ের কোন কারণ নেই।

কেন কবিরাজরা ঝারফুক করলে সাপ কামড়ানো রোগী ভালো হয়?

এটি আসলে একটি ভুল তথ্য। আমাদের দেশে মাত্র ৪ প্রজাতির বিষাক্ত সাপ আছে-কালকেউটে, গোখরা, রাসেল ভাইপার আর গ্রিনপিট ভাইপার। আর সমুদ্রে সামুদ্রিক সাপ বিষাক্ত। এদের মধ্যে আমাদের এদিকে শুধুমাত্র কালকেউটে, গোখরা সাপ পাওয়া যায়। ইদানিং রাজশাহীর বরেন্দ্রতে রাসেল ভাইপার পাওয়া গেছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে বিষাক্ত সাপের সংখ্যা খুব কম। তাই ১০০ জন মানুষকে যদি সাপ কামড়ায় তাদের মধ্যে ৯৮ জনকেই অবিষাক্ত সাপ কামড়াবে। মাত্র ২/৩ জনকে বিষাক্ত সাপ কামড়াবে। কবিরাজ যদি এই ১০০ জন রোগীকে ঝারফুক শুরু করে তবে ৯৫ জনেও বেশি ভালো হবে আর যে ২/৩ জনকে যাদের বিষাক্ত সাপ কামড় দিয়েছে তারা ভালো হবেন না। তাদেরকে কবিরাজ বলবে যে আমি পারব না, মেডিকেলে নেন। তাহলে কবিরাজ এর সফলতার হার ৯৫%!

তাই সবাই বলে, কবিরাজ সাপ কামড়ানো রোগী ভালো করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বিষাক্ত সাপে কামড়ানো রোগীগুলোর ঝাড়-ফুঁকের এই সময়টা অনেক মূল্যবান। এ সব না করে রোগীকে দ্রুত হাস্পাতালে পাঠালে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে রোগী ভালো হবার সম্ভবনা অনেক বেশি। এসব ঝাড়-ফুঁক করে সময় নষ্ট করার কারণে অধিকাংশ বিষাক্ত সাপে কামড়ানো রোগী হাস্পাতালে যাবার রাস্তায় মারা যায়। 

লেখক: ডা. রতীন্দ্র নাথ মন্ডল, মেডিসিন স্পেশালিস্ট, রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ
নিউজওয়ান২৪.কম/একে

নিউজওয়ান২৪.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন: